• শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন

ভারতে নতুন রাজনৈতিক দল ”ককরোচ জনতা পার্টি”

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ৩ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে এবার ব্যতিক্রমী এক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন শুরু হয়েছে। জেদি, অবিনাশী ও ঘৃণিত পতঙ্গ হিসেবে পরিচিত ‘তেলাপোকা’কে (ইংরেজিতে ককরোচ) প্রতীক করে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন চলছে মূলত অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ে কোটি কোটি মানুষ এবং মূলধারার গণমাধ্যমের নজরে এসেছে এটি। দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে এ আন্দোলন এখন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। খবর বিবিসি।

গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত। একটি মামলার শুনানির সময় সাংবাদিকতা ও অ্যাক্টিভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়া বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন তিনি। এরপরই এ নিয়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। এক পর্যায়ে এ মন্তব্য নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হয় তাকে। সে সময় তিনি বলেন, মন্তব্যটি সামগ্রিক যুবসমাজের উদ্দেশ্যে নয়, বরং কেবল ‘ভুয়া ডিগ্রিধারী’ ব্যক্তিদের ঘিরে ছিল।

সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’র (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিলিয়ে প্যারোডি হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) আত্মপ্রকাশ ঘটে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দাবি করা বিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী যেখানে ৯০ লাখের কম, সেখানে এক সপ্তাহের কম সময়ে সিজেপি প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ অনুসারী অর্জন করেছে। তবে আইনি কারণ দেখিয়ে তাদের ২ লক্ষাধিক ফলোয়ারসমৃদ্ধ ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে ভারতে ব্লক করে রাখা হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি অনলাইন-ভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন। এর সদস্যপদের রসাত্মক যোগ্যতার তালিকায় রয়েছে—বেকার, অলস, সার্বক্ষণিক অনলাইন উপস্থিতি এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা।

বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এখন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। সেখানে যাওয়ার আগে তিনি ভারতের ‘আম আদমি পার্টি’র (আপ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিমে কাজ করেছেন। এ দল মূলত এক দশকেরও বেশি সময় আগে ভারতের একটি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য পরিচিত।

সিজেপি নিয়ে দিপকে জানান, আমি ভেবেছিলাম আমাদের সবার একসঙ্গে এগিয়ে আসা উচিত, হয়তো শুধু একটা প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা আমার কল্পনার চেয়েও অনেক বড় ছিল।

কয়েক দিনের মধ্যে গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ সিজেপির সদস্যপদের জন্য নিবন্ধন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘#MainBhiCockroach’ (আমিও তেলাপোকা) হ্যাশট্যাগ উঠে এসেছে ট্রেন্ডিং তালিকায়। এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের মতো বিরোধী শিবিরের ব্যক্তিত্বরা। এমনকি শীর্ষ বিরোধী নেতা অখিলেশ যাদব ‘এক্স’-এ ‘বিজেপি বনাম সিজেপি’ লিখে পোস্ট করেছেন। অনলাইনের বাইরেও তরুণদের তেলাপোকার পোশাক পরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করলেও দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি কতটুকু পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ দেশজুড়ে লাখ লাখ সক্রিয় সদস্য নিয়ে বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসই এখনো মূল রাজনৈতিক শক্তি। তাই সমালোচকদের অনেকে সিজেপিকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ বা আন্দোলন না বলে বিরোধীদের সহায়তায় তৈরি ‘ডিজিটাল নাটক’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তবে সিজেপির এ আকস্মিক উত্থানকে দেশটির তরুণদের রাজনৈতিক ক্লান্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চাকরি, মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্যের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে তরুণ বা জেন-জিদের বড় আন্দোলন দেখা গেলেও ভারতে পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে সেখানকার তরুণদের মধ্যেও সুপ্ত হতাশা রয়েছে। সিজেপির ইশতেহারে হাস্যরসের আড়ালে জবাবদিহিতা, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীদের প্রতিনিধিত্বের মতো চেনা রাজনৈতিক দাবিগুলোই তুলে ধরা হয়েছে।

দিপকে বলেন, মানুষ হতাশ। কারণ তারা মনে করে না তাদের কথা শোনা হচ্ছে বা তাদের প্রতিনিধিত্ব করা হচ্ছে।

রাজনীতিতে এ ধরনের রসাত্মক মেলবন্ধন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন নয়। ইতালিতে কৌতুক অভিনেতা বেপ্পে গ্রিলোর ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’ কিংবা ইউক্রেনে ভলোদিমির জেলেনস্কির অভিনেতা থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়া এর বড় উদাহরণ। ভারতের সংস্করণটি মূলত ইন্টারনেট ও মিম-ভিত্তিক।

অভিজিৎ দিপকের বলেন, জেনারেশন জেড (জেন জি) ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে, তারা বিরক্তও বটে। এমন নয় যে তরুণ ভারতীয়রা আরেকটি রাজনৈতিক দল চায়। বরং অনেকেই তাদের হতাশা প্রকাশের একটি ভাষা খুঁজছেন। আমি মনে করি সিজেপি কেবল শুরু।

তিনি জানান, সিজেপির ওয়েবসাইটটি তরুণ বা জেন-জিদের এ ভাবনাকেই প্রতিফলিত করে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এ আন্দোলন যেভাবে দ্রুত এসেছে, সেভাবেই আবার হারিয়ে যেতে পারে। তবে ফলাফল যাই হোক, সিজেপি ভারতীয় তরুণদের একাংশকে সাময়িকভাবে হলেও এ বার্তা দিতে পেরেছে যে, রাজনীতিতে তাদের অস্তিত্বকে গ্রাহ্য করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...
https://slotbet.online/