স্বরূপকাঠির আটঘর খালে এখনো নৌকার ছন্দে জল কাঁপে। পেয়ারা বাগান দেখাশোনা, হাটে যাওয়া, নিত্যযাতায়াত—সব কিছুর ভরসা সেই ছোট ডিঙি নৌকা। কিন্তু সেই নৌকাই এখন পাড়ি দিয়েছে হাজার মাইল দূরে, ইউরোপে। নদীতে ভাসার জন্য নয়, স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার বাড়িঘরে শৌখিন আসবাব হিসেবে জায়গা করে নিতে।
আটঘর এলাকার কারিগর আজিজুল হকের হাতে তৈরি ১০টি নৌকা ইতোমধ্যে পৌঁছেছে স্পেনে। স্থানীয় প্রয়োজনের জিনিস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্য-এই হঠাৎ রূপান্তরই এখন আলোচনার কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, স্বরূপকাঠির নৌকা এখন শুধু খালের গল্প নয়। এটি একসঙ্গে সম্ভাবনা, বাজার আর পরিবেশ, এই তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা একটি পরিবর্তনের গল্প। যেই গল্পটা বুনতে হবে পরিবেশের ভারসাম্যের বিষয়টি সামনে রেখে, এমনটিই বলছেন পরিবেশদাবী সংগঠন।
এক্সোটিক ফার্নিচার হিসেবে নতুন যাত্রা : খুলনার রূপসা কাঁচাবাজার এলাকার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাওবা এক্সপো নৌকার এই বিদেশ যাত্রার উদ্যোগের পেছনে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ওয়াসিকুর রাববী বলছেন, এক্সোটিক ফার্নিচার হিসেবে নৌকার যাত্রা শুরু হয়েছে মাত্র। ইউরোপের আরও দেশে এই পণ্যের বাজার তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
ওয়াসিকুর রাববী দাবি, জার্মানিতে ব্যবসায়িক অংশীদার পল হলামের সঙ্গে যৌথভাবে এই রপ্তানি কার্যক্রম এগোচ্ছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর হয়ে নৌপথে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় পৌঁছেছে নৌকাগুলো।
ভাসমান হাট থেকে ইউরোপের বাজার : ২০২৪ সালের এপ্রিলের এক শুক্রবার। আটঘর খালের ভাসমান নৌকার হাটে এসে থমকে যান জার্মান নাগরিক পল হলাম। সারি সারি কাঠের নৌকা দেখে সেখানেই মাথায় আসে নতুন ভাবনা। এই নৌকাই হতে পারে ড্রয়িংরুমের শৌখিন আসবাব সেই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল।
কারিগর আজিজুল হকের সঙ্গে সেখানেই হয় চুক্তি। নতুন নকশায় ১০টি নৌকা তৈরির অর্ডার। প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতায় এটাই ছিল আজিজুল হকের প্রথম বিদেশি কাজ।
আজিজুল বলেন, ‘ আমি সাধারণত ডিঙি নৌকাই বানাই। পেয়ারা বাগান থেকে বাজার সব কাজে লাগে। কিন্তু এবার যে ডিজাইন দেওয়া হলো, সেটা একেবারেই আলাদা। মেহগনি কাঠ দিয়ে বানিয়েছি।’
প্রতিটি নৌকার দাম ধরা হয়েছিল ১০ হাজার টাকা। নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ হয়। পরে খুলনায় নিয়ে বার্নিশ, ফিনিশিং ও গদি বসিয়ে ২০২৫ সালের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে জাহাজে তোলা হয়।
নদীর নৌকা, এখন ঘরের আসবাব : এই নৌকাগুলো আর পানিতে নামেনি। স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় রিসোর্ট ও বাড়িঘরে এগুলো এখন বসার আসন বা সাজসজ্জার অংশ। খালের বাস্তবতা থেকে ইউরোপের অভিজাত ঘরে, নৌকার এই যাত্রাই গল্পটিকে আলাদা করে দেয়।
স্বীকৃতি, কিন্তু সতর্কতাও : বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) পিরোজপুরের ভারপ্রাপ্ত উপব্যবস্থাপক এইচ এম ফাইজুর রহমান বলছেন, এটি শুধু একটি রপ্তানি নয়, স্থানীয় কারিগরদের কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
তবে এই সাফল্যের মাঝেই পরিবেশের ওপর প্রভাবের উঠে আসছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বরিশাল বিভাগের সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, নৌকা তৈরি নিজে খুব বড় দূষণ তৈরি না করলেও কাঠের উৎসটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি টেকসই বন ব্যবস্থাপনা না থাকে, তাহলে চাহিদা বাড়লে বন উজাড়ের ঝুঁকি তৈরি হবে।
লিংকন বায়েন আরো বলেন, কাঠ ছাড়া নৌকায় বার্নিশ ও রাসায়নিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। রপ্তানির সুযোগ যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
ঐতিহ্য বনাম চাপ : স্থানীয় সংগঠক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আটঘর নৌকার হাট দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড়। মৌসুমে এখানে প্রায় ৩০ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয়, অন্তত ৫০০ পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি আরো বলেন, একসময় যা ছিল প্রয়োজনের জিনিস, এখন তা বিলাসপণ্যে পরিণত হচ্ছে। এটা সম্ভাবনার দরজা খুলছে, আবার চাপও তৈরি করতে পারে।
নৌকার তৈরী থেকে বিদেশ যাত্রা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্বরূপকাঠী ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাকিব হোসেন জড়িত ছিলেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ৯টি নৌকা বিক্রি হয়েছে। নতুন করে আরও ২০টি নৌকার অর্ডারের কথাও শোনা যাচ্ছে।
এ রকম আরো সংবাদ...