বিশেষ করে মরিচ, সবজি, ফল ও পশুখাদ্যের মতো বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। আর কমেছে ভুট্টা ও তৈলবীজ জাতীয় ফসলের উৎপাদন।
বিবিএসের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নারী-পুরুষ উভয় কৃষি শ্রমিকের মজুরি কমেছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৬২১ টাকা ছিল। পরের দুই মাসে অর্থাৎ আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মজুরি কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৬১৬ ও ৬০৮ টাকায়। নভেম্বরে ৫৭০ টাকা, ডিসেম্বরে ৫৭৫, জানুয়ারিতে ৫৮০ ও ফেব্রুয়ারিতে মজুরি কমে হয় আনুমানিক ৫৭৮ টাকা। একই অবস্থা নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও। জুলাইয়ে মজুরি ছিল ৪৬১ টাকা। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে যথাক্রমে দাঁড়ায় ৪৬০ ও ৪৪৮ টাকা। নভেম্বরে নারীদের মজুরি ছিল ৪১০ টাকা, ডিসেম্বরে ৪১৫, জানুয়ারিতে ৪২০ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪১৫ টাকা (আনুমানিক)। কোনো ক্ষেত্রে কৃষিশ্রমিকদের টাকার সঙ্গে খাবারও দেয়া হয়। খাবারের অর্থমূল্য বিবেচনায় এ মজুরির পরিমাণ আরো কম।
দেশে শ্রমিকদের মজুরির হার কমার তথ্য পাওয়া গেছে বিবিএসের ভোক্তা মূল্যসূচকেও। সেখানে দেখা গেছে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় মজুরি হার কমে হয়েছে ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। কৃষি খাতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভেদে মজুরির হার নেমেছে ৮ দশমিক ১০ শতাংশে। জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এক বছর আগে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই চিত্র সেবা খাতেও, তবে মজুরি বেড়েছে শিল্প খাতের শ্রমিকদের।
দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশের বেশি শ্রমিক কৃষি খাতে জড়িত থাকলেও মজুরি কমার ফলে কৃষিশ্রমিকরা পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিকরা বলছেন, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে ৬০০ টাকা মজুরি খুবই কম। শিল্প বা অন্য খাতে একই পরিমাণ সময় শ্রম দিয়ে বেশি আয় সম্ভব হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে যেখানে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ার কথা, সেখানে উল্টো কমছে। অথচ উৎপাদনের দিকে তাকালে দেখা যায় শাকসবজি, ফলমূলসহ অনেক ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। শ্রমিকরা উৎপাদন করলেও ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। অনেক কৃষিশ্রমিক পেশা পরিবর্তন করতে পারলেও বড় একটি অংশ কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হন।’
কৃষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। গত বোরো মৌসুমে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় তিন বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেন কৃষক নাসির হোসেন। তার প্রায় ১৩ জন শ্রমিক লেগেছে। শ্রমিকপ্রতি মজুরি দিতে হয়েছে গড়ে ৮০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘এখন আবাদ করতে যে পরিমাণ খরচ হয় সেটি নিয়ে লাভ করার সুযোগ থাকে না। তিন বিঘা জমি আবাদ করতে শ্রমিকের মজুরি দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা। এটি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। যদিও দৈনিক এ মজুরি অনেক বেশি তা কিন্তু নয়। বর্তমান বাজারে কম হলেও সেটি নির্ভর করে উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের ওপর। শ্রমিক, সার ও কীটনাশকে যে ব্যয় হয় তা দিয়ে ফসল তোলার পর আর কিছু থাকে না।’
কৃষিশ্রমিকের পেশা ছেড়ে অনেকের অন্য পেশায় যাওয়ারও প্রবণতা বেড়েছে। কুমিল্লার লালমাই এলাকার খোকন মিয়া ২০ বছর ধরে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও গত দুই বছর ধরে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাজারে যে মজুরি শ্রমিকদের দেয়া হয় তা খুবই অপ্রতুল। রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে এর চেয়ে বেশি ইনকাম সম্ভব হচ্ছে।’
এদিকে কৃষি খাতে শ্রমিকের মজুরি কমলেও বেড়েছে মরিচ, সবজি, ফল ও পশুখাদ্যের উৎপাদন। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মরিচ উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৪ টন, সবজির উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ১৯ লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৫ টন। এছাড়া ফলের আবাদ হয়েছে ৩৯ লাখ ৮৬ হাজার ৬২৮ টন। পশুখাদ্যের উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৮৯৯ টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। তবে কমেছে ভুট্টা ও তৈলবীজের আবাদ। এ সময়ে ভুট্টা উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮৭৭ টন ও তৈলবীজ উৎপাদন হয়েছে ২৬ হাজার ৬১৬ টন, যা আগের বছরের তুলনায় কম।
উৎপাদন চাহিদার তুলনায় এটা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। সার্বিক বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন যে বেড়েছে তা কিন্তু যথেষ্ট নয়। লাভ কমলে পেমেন্ট কমে। কৃষক চাইলেও শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়ে দিতে পারে না। কৃষকের যখন উৎপাদন ও লাভ কমে যাবে তখন কম দামেই সে শ্রমিক নিয়োগ দেবে। উৎপাদনে মুনাফা হ্রাস পেলে সে আর মজুরি দিতে পারে না। অনেক শ্রমিকও অন্য পেশায় যেতে না পেরে কৃষি খাতে থেকে যায়। কম দামে তাকে শ্রম দিতে হয়।’
ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক এ উপাচার্য আরো বলেন, ‘যেসব ফসলের উৎপাদন বেড়েছে তার কারণ দাম বেশি পাওয়া। কৃষক দাম বেশি পাওয়ায় শাক-সবজির মতো ফসল আবাদ করেছে, যার কারণে ভুট্টার আবাদ কম হয়েছে।’
https://slotbet.online/