ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আগাম জাতের তরমুজ চলে আসলেও এখনো বিক্রি জমে উঠেনি। এবছর মৌসুম শুরুর আগেই বরিশালের বাজারে উঠতে শুরু করেছে তরমুজ। আগাম তরমুজের বাজার তৈরি না হলেও আবাদে রেকর্ড করেছে দক্ষিণাঞ্চল। গত মৌসুমের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। বাজার পেলে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে তরমুজ।
এবছর বরিশাল বিভাগে ৬ জেলায় তরমুজ চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে ৬২৬৮৭ হেক্টটর জমিতে। ইতোমধ্যে চাষাবাদ হয়েছে ৬৮৮৪২ হেক্টার জমিতে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় চাষাবাদ হয়েছে ২৫১০ হেক্টার জমি। পিরোজপুরে ৩৫২ হেক্টর। ঝালকাঠিতে ৯৭ হেক্টর। পটুয়াখালীতে ৩৪৫৬৬ হেক্টর। বরগুনায় ১২২৭৯ হেক্টার ও ভোলায় ১৯০৩৮ হেক্টও জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। ইতো মধ্যে ফলন দিয়েছে এবং বাজারে আসতে শুরু করেছে। এর বাইরে আগাম জাতের তরমুজ রয়েছে বাজারে।
বরিশালের সবচেয়ে বড় তরমুজের মোকাম পোর্ট রোড বাজার। সেখানেই ১০ থেকে ১৫টি ফলের আড়তে বিক্রি হয় তরমুজ। বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই আড়তগুলোতে দেখা যায় ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম বেশ ভালো।
তিন থেকে পাঁচ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজ আড়তদাররাই বিক্রি করছেন গড়ে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা দরে। এতে প্রতি পিস তরমুজ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা পড়ে যায়। আর কেজিদর হিসাব করলে প্রতি কেজি তরমুজের পাইকারি দাম পড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা।
তবে খুচরা বাজারে তরমুজ বিক্রির চিত্র একেবারেই উল্টো। নগরীর পোর্ট রোড, হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা, নতুন বাজার ও পুরাতন বাজার—এই চারটি বাজারে ঘুরে দেখা যায় প্রতি কেজি তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে। তবে যে তরমুজ কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে ওই তরমুজই খুচরা বিক্রেতারা পিস হিসাবে ক্রয় করেছেন।
নগরীর পেট্ররোড বাজারের খুচরা তরমুজ বিক্রেতা আলি হোসেন বলেন, এক পিস তরমুজ ৩০০ টাকা করে কিনেছি। তাতে আড়াই থেকে তিন কেজি ওজন হবে গড়ে। এখন আমি এক পিস তরমুজ ৫০০ টাকা দাম চাইলে ক্রেতা নিতে চাইবে না। তাই কেজি হিসেবে তরমুজ বিক্রি করা হচ্ছে।
একই এলাকার কবির হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, তিন কেজি ওজনের একটি তরমুজ কিনেছি ৫৪০ টাকা দিয়ে। তাতে কেজি ১৮০ টাকা করে পড়ে যায়।
পটুয়াখালীর গলাচিপা এলাকার তরমুজ চাষি আলম গাজী এক হাজার ৮০০ পিস তরমুজ নিয়ে এসেছেন বরিশাল পোর্ট রোড তরমুজ বাজারের বাবা মায়ের দোয়া ফলের আড়তে। ওই আড়তের মালিক রফিকুল ইসলাম ১০০ তরমুজে ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। চাষি আলম গাজী বলেন, আমি যে তরমুজ এনেছি তা তিন থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত ওজন হবে। তবে গড়ে একটি তরমুজে ২০০ টাকা করে পেয়েছি। এতে আমার অর্ধেক খরচ উঠবে না।
বরিশাল পোর্ট রোডের আড়তে গিয়ে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন বেশি, আর বাজারে দরও ভালো। ভোলা, পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ট্রলারভর্তি তরমুজ এসে ভিড়ছে বরিশালের ঘাটে। সেখান থেকে পাইকাররা কিনে নিচ্ছেন। স্থানীয় শ্রমিকদের জন্যও তৈরি হয়েছে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ।
কৃষকরা জানান, এ বছর শীত দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রকোপ কমেছে, ফলন এসেছে সময়মতো। দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যেই ক্ষেত থেকে ঘরে তুলছেন পাকা ফল।
পাইকারি ক্রেতা ফরহাদ বলেন, তরমুজ আমরা বরিশালে কিনে তা সাতক্ষীরা পাঠাব। সেখানে ভালো বাজার পাওয়া যেতে পারে। প্রথম চালানে ৩ হাজার পিস পাঠাচ্ছি।
চরফ্যাশন উপজেলা থেকে তরমুজ নিয়ে আসা কৃষক সেলিম হাওলাদার বলেন, এবছরও আগাম জাতের তরমুজ নিয়ে এসেছি বরিশালে। মৌসুমের তরমুজ উঠতে আরও মাসখানেক সময় লাগবে। গত বছর আগাম তরমুজ বিক্রি করে সাড়ে চার লাখ টাকা লাভ হয়। এবার প্রায় আড়াই লাখ টাকা খাটিয়ে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৭ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি। মৌসুমের তরমুজ উঠে গেছে আগাম জাতের তরমুজের চাহিদা তেমন থাকে না।
গলাচিপা থেকে তরমুজ নিয়ে আসা কৃষক আসা মো. ইমাম গাজী জানান, ৪০ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। দুটি ট্রলারে ৫ হাজার পিস তরমুজ নিয়ে বরিশালে এসেছি। এখনো বিক্রি করতে পারেনি। তবে আশা করছি সব তরমুজ বিক্রি করতে পারবো।
তিনি বলেন, এ বছর অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত রোদ আর রোগবালাই কম থাকায় এ বছর ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারেও মিলছে আশাব্যঞ্জক দাম। পোর্ট রোডের আড়তদার আল্লাহর দান ফার্ম দুইয়ের মো. মেহেদি হাসান জানান, ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আড়তে তরমুজ নিয়ে আসছে চাষিরা। আগাম জাতের তরমুজ হওয়ায় এসব তরমুজ সাইজে ছোট। প্রতি ১০০ তরমুজ তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশালের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শিকদার জানান, কম খরচে ভালো ফলনের মাধ্যমে লাভবান হওয়ায় তরমুজ চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। জমি তৈরি থেকে মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রায় চার মাসের মতো সময় লাগে। এ ছাড়া তরমুজ উচ্চফলনশীল হওয়ায় অনেকেই পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছেন। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে তরমুজ চাষের মাধ্যমে বরিশাল অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনবে। তিনি আরও বলেন, আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে। তরমুজের ফলন সবসময়ে বরিশাল বিভাগে ভালো হয়। বাজারে কৃষক দাম ভালো পেলে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে বলে আশা করছি।
তিনি আরো বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা একদিকে যেমন কৃষকদের ঠকাচ্ছে, অন্যদিকে তাদের কারণেই ক্রেতারা চড়া দামে তরমুজ কিনে খাচ্ছে। বিষয়টি রোধ করতে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
https://slotbet.online/