বরিশাল নগরীর প্যারারা রোড এলাকায় দৈনিক সমকালের বরিশাল অফিস থেকে পত্রিকাটির সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এ সময় লাশের পাশ থেকে তার (পুলক) নিজ হাতে লেখা আবগঘণ পাঁচটি সুইসাইড নোট (চিরকুট) উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় অফিসের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলক চ্যাটার্জী তার স্ত্রী ও মেয়ে, ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জী, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরী ও প্রশাসনের উদ্দেশ্যে পৃথক সুইসাইড নোট লিখে গেছেন।
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে সুইসাইড নোটে পুলক চ্যাটার্জি উল্লেখ করেছেন, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলাম না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ইন্ডিয়ার ভেলোরে পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে মানসিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে। শরীরের যন্ত্রণাকালে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনো প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
পুলক চ্যাটার্জি তার স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে লিখেছেন, আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি, তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াংকা, আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হবার নয়। তারপরও কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সাথে থেকো। দীপক তোমাকে আগলে রাখবে।
বরিশাল প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনের উদ্দেশ্যে পুলক চ্যাটার্জী লিখেছেন, জাকির বিদায়। তোমার সাথে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম, তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নাই। পারলে তোমার বৌদি ও প্রকৃতির মাঝে মাঝে খোঁজ নিও।
ভাই দীপক ও দীপকের স্ত্রী ইতির উদ্দেশ্যে পুলক চ্যাটার্জি লিখেছেন, বিদায়। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর ওপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে দেবাশীষের সাথে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।
পুলক তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী দৈনিক সমকাল বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরীর উদ্দেশ্যে লিখেছেন, সুমন, বিদায়। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। একসাথে প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছি, কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বৌদির হাতে দিও।
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যার পরে সমকাল বরিশাল অফিস থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে পুলিশ।
বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ বলেছেন, সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
সূত্রমতে, পুলক চ্যাটার্জি দৈনিক সমকাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে বরিশালের ব্যুরো প্রধান হিসেবে ব্যাপক সুনাম ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করেন। এরপর থেকেই তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
সমকাল কর্তৃপক্ষ পুলক চ্যাটার্জিকে চাকরিচ্যুত করলেও বর্তমানে সমকালের বরিশাল ব্যুরো দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরী তার (পুলক) ওপর সম্মান প্রদর্শন করে অফিসের একটি চাবি দিয়ে বলেছেন, আপনি আগের মতো অফিসে যখন খুশি বসবেন। এরপর মাঝে মধ্যে সমকাল অফিসে এসে তিনি (পুলক) বসতেন।
সেমতে শুক্রবার কোন এক সময়ে পুলক চ্যাটার্জি সমকাল অফিসে এসে বসেন। ওইদিন সন্ধ্যায় সুমন চৌধুরী অফিসে এসে বাহির থেকে তালা খোলা দেখলেও দরজায় ভেতর থেকে আটকানো দেখতে পান।
পরবর্তীতে তাৎক্ষণিক তিনি (সুমন) বিষয়টি পাশ্ববর্তী অফিসের সহকর্মী ও বাড়ির মালিককে বিষয়টি অবহিত করেন। এরপর তারা থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পুলক চ্যাটার্জির গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেন।
পুলক চ্যাটার্জি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সিনিয়র সদস্য এবং বরিশালে কর্মরতো বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার ব্যুরো প্রধানদের সংগঠন ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চীফ অ্যাসোসিয়েশন (এনডিবিএ)’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
একজন নিষ্ঠাবান কলমযোদ্ধার শেষ পরিনতি আত্মহত্যার বিষয়ে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর তার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেছেন-“একজন সাংবাদিক যখন আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেয় তখন আর কিছুই বলার থাকেনা। তবে এতটুকু বলতেই হয় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা অঙ্গনে রাষ্ট্রীয় কোনো নীতিমালা না থাকায় যে কাউকে যখন তখন বাদ দেওয়া যায়।
ফলে মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করে এভাবেই একজন সাংবাদিক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। আর যেনো কোনো সাংবাদিক এভাবে মানসিক যন্ত্রণার শিকার না হন তা নিয়ে একটু ভাবনার সময় কি আপনার কাছে হবে? তাহলে ভাবুন আপনার-আমার অরক্ষিত এই গণমাধ্যম অঙ্গনকে কিভাবে সুরক্ষিত করে তোলা যায়, কিভাবে বৈষম্য মুক্ত করে গড়ে তোলা যায় আমাদের গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতা অঙ্গনকে।
আত্মহত্যার শিকার পুলক চ্যাটার্জি ছিলেন দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো প্রধান এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। সুইসাইড নোটে তার আত্মহত্যার কারণ ফুটে উঠেছে। তারপরও এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কী কারণে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যু হলো।
সমাজে গলা উঁচিয়ে তারা কথা বলে! যেদল ক্ষমতায় থাকে সেদলের লেজুড়বৃত্তি করে বিত্ত বৈভবের মালিক হন, গণমাধ্যমের মালিক হন। অথচ আর্থিক টানাপোড়নে পড়তে হয় গণমাধ্যম কর্মিদের। আর কত মৃত্যু হলে টনক নড়বে গণমাধ্যম কর্মিদের ???? আর কত দালালি করবেন গণমাধ্যম সংগঠনের নেতারা !!!
https://slotbet.online/