• সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন

উপকূলে শিশুর কাঁধে শ্রমের জোয়াল

পটুয়াখালী প্রতিনিধি / ৩২ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

খেলার বয়সে কাঁধে শ্রমের বোঝা। কারও হাতে জাল, কারও মাথায় মাছের ঝুড়ি, কেউ আবার বরফকলে শ্রমিক। দারিদ্র্য, নদীভাঙন আর জলবায়ু সংকটের চাপে উপকূলের হাজারো শিশু হারাচ্ছে তাদের শৈশব। যে বয়সে থাকার কথা স্কুলে, সেই বয়সেই তাদের জীবন জড়িয়ে গেছে কঠিন জীবিকার লড়াইয়ে।

পটুয়াখালীর উপকূলীয় রাঙ্গাবালী, গলাচিপা, কলাপাড়া ও বাউফল  উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে এক নির্মম বাস্তবতা। কোমলমতি শিশুদের হাতে বইয়ের বদলে উঠে এসেছে শ্রমের ভার। তাদের কানে পৌঁছায় না স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি। ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা নেমে পড়ে নদী বা সমুদ্রে, অথবা ছুটে যায় বরফকল, শুঁটকি পল্লী কিংবা মাছের আড়তে।

নৌকাই যার বাড়ি, শ্রমই যার জীবন : পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়া ঘাট। আগুনমুখা নদীর তীরে নোঙর করা একটি নৌকাই ১২ বছর বয়সী জাহাঙ্গীরের বাড়ি। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে বহু বছর আগে পরিবারসহ আশ্রয় নিয়েছে এই নৌকায়। জন্ম থেকে নদীর সঙ্গে লড়াই করেই বড় হওয়া জাহাঙ্গীর এখন পাকা  মাঝি। মাত্র আট বছর বয়সেই শুরু তার পূর্ণাঙ্গ শ্রমজীবন। ভোর হলেই নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সাগরের দিকে। ঢেউ, ঝড়—কিছুই থামাতে পারে না তাকে। তবে এখন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে, তাই অন্যের নৌকায় জাল সেলাই করে যা পায়, তা দিয়েই চলে সংসার।
জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা হলে তার কণ্ঠে ভেসে ওঠে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস। সে জানায়, পড়াশোনা করার স্বপ্ন ছিল তার, কিন্তু অভাব সেই স্বপ্নকে ছুঁতে দেয়নি। জাহাঙ্গীর বলে, ‘নদী আমাগো বাড়ি-ঘর সব কাইরা নিছে। এহন আমাগো যায়গা জমি কিছু নেই। ছোটকাল থেইকা এই আগুনমুহা নদীর মধ্যে নৌকায় থাহি (বসবাস করি)। পড়ালেহা করার শখ হইছিল, কিন্তু কেমনে পড়মু। ঘরে তো ভাত নাই। ঠিকমতো খাইতে পাইনা। বাবা অসুস্থ। ঠিকমতো মাছ ধরতে পারে না। মা নিজেগো নৌকায় মাছ ধরাইরা যা কামাই করে, তা দিয়া সংসার চলে না। ৮ বছর বয়স হওয়ার পর যহন বুঝতে পারছি সবকিছু, তহন মাইনসের নৌকায় কাজ শুরু করি। দৈনিক আড়াইশো তিনশো টাহা পাই হেইয়া দিয়া সংসার চালাই। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে নৌকায় নৌকায় গিয়ে জাল সেলাই করি। লেখাপড়া করার ইচ্ছে আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন,  দিন-রাত নদীতে থাকি, স্কুলে কখন যামু? স্কুলে গেলে খাওয়া দেবে কেডা?’


‘ঘরে ভাত না থাকলে স্কুল দিয়া কী করমু’ :  
একই চিত্র ১৪ বছর বয়সী রুমান সরদারের জীবনেও। বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সে। এরপর সংসারের অভাবের কারণে আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। এখন নিয়মিত স্থানীয় একটি বরফকলে শ্রমিকের কাজ করে। এতে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। আবার বরফকলে কাজ না থাকলে অন্য জেলের নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরে সে।
দীর্ঘ আলাপচারিতার স্কুলে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে রুমান বলেন, ‘স্কুল গেলে তো খাওন পাওয়া যায় না। ঘরে ভাত না থাকলে স্কুল দিয়া কী করমু? স্কুলে গেলে কি আর বড় কিছু হইতে পারুম? কাম (কাজ) কইরাই তো খাইতে অইবে, তাই কামই করি।
রুমানের পাশেই বসা ১৪ বছর বয়সী রুবেল হাওলাদারের গল্প আরও বেদনাদায়ক। মায়ের মৃত্যু, বাবার নতুন সংসার—সব মিলিয়ে ছোটবেলা থেকেই জীবনের দায় এসে পড়ে তার কাঁধে। কোনো দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এখন নদীতে মাছ ধরেই সংসার চালাতে সাহায্য করে সে।
রুবেল জানান, ‘মা মারা যাওয়ার আগ থেকেই নদীতে মাছ ধরি এবং পরিবারকে টাকা দেই। এখনও মাছ ধরে আয় করা টাকা বৃদ্ধ নানাকে দিই। কোনো দিন স্কুলে যাওয়া হয়নি।’

শ্রমিকের অভাব পূরনে শিশু: বোয়ালিয়ার জেলে পল্লী থেকে স্পিড বোটে আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলেই চরমোন্তাজ মান্তা পল্লী।  সেখানে ঘুরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন শিশুর দেখা পাওয়া যায়। যাদের বয়স ৭ বছর থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এসব শিশুর মধ্যে অনেকেই নদীতে মাছ ধরে। কেউ বাবার সঙ্গে, কেউ মায়ের সঙ্গে। আবার কেউ অন্যের নৌকায়। মায়ের আঁচল ধরে থাকার বয়সী এসব শিশুর সারা দিন কেটে যায় আগুনমুখার বুকে। নদীতে আছড়ে পড়া বড় বড় ঢেউ আর রোদ-বৃষ্টি তাদের নিত্যসঙ্গী। সারা দিন নদীতে ঘুরে সন্ধ্যার আগে আগে ঘাটে আসে তারা। সূর্য ডোবা পর্যন্ত সমবয়সীদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে। নদীর তীর ধরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ায় তারা।
ছুঁই ছুঁই সন্ধ্যায় আগুনমুখার তীরে বসে ছিল আট বছর বয়সী সাকিব। সারা দিন মা শেফালি বেগমের (২৫) সঙ্গে আগুনমুখার বুক চষে বেড়িয়েছে ছোট্ট শিশুটি। ওই দিন নদী উত্তাল থাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই তীরে ফিরে আসে তারা। গায়ে নীল রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি ও কালো রঙের হাফপ্যান্টে ফুটে উঠেছে সাকিবের মলিনতা। গলায় লটকানো কবিরাজের একটি মাদুলি, দুই হাতে সুতায় তৈরি কিছু বাঁধা।
সাকিবের মা শেফালি বেগম বলেন, তাঁর স্বামী পান্নু মাঝি নানা রোগে আক্রান্ত। নদীতে নৌকা চালাতে হলে একজন সহযোগী বা শ্রমিক দরকার। তাই বাধ্য হয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাছ ধরতে হয় তাঁকে। এতে শ্রমিকের মজুরিও বেঁচে যায় আর ছেলেটিও ধীরে ধীরে কাজ শিখছে।
দারিদ্র্য আর জলবায়ুর আঘাত : এই বাস্তবতার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে জলবায়ু পরিবর্তন। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস—প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত করছে উপকূলের পরিবারগুলোকে। আলেয়া বেগমের মতো অনেকেই ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নদীর তীরে বা নৌকায়। সংসারের চাপে তিনিও তার ১০ বছর বয়সী ছেলেকে মাছ ধরার কাজে পাঠিয়েছেন। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট পরিবারগুলোকে বাধ্য করছে শিশুদের শ্রমে ঠেলে দিতে।
উপকূলের মৎস্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই দারিদ্র্যই শিশুদের স্কুল থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক পরিবারে শিশুদের আয়ই হয়ে উঠছে টিকে থাকার প্রধান ভরসা। তাই বাবা নিজেরাই আদরের শিশুটির কাঁধে দিচ্ছেন শ্রমের জোয়াল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।’

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা: অপ্রাপ্ত বয়সে কঠোর শ্রম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. ওয়াহিদ শামীম বলেন, ‘শিশুদের শরীর এখনো পুরোপুরি গঠিত হয় না। এই সময়ে কঠোর শ্রম দিলে তাদের পুষ্টিহীনতা, শারীরিক বিকলতা, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।
তার মতে, এই শিশুদের একটি বড় অংশ নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পায় না। আবার দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা, রোদে কাজ করা—এসব কারণে বিভিন্ন সংক্রমণ ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। এই শিশু শ্রম থেকে বেড়িয়ে না আসতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে জাতিগঠনের সমস্যায় পরতে হবে।’

পরিসংখ্যান যা বলছে: ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কিছুটা কমলেও সামগ্রিক শিশুশ্রমের হার বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৭ শতাংশে (প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু)। কিন্তু একই সময়ে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শ্রমে যুক্ত থাকার সামগ্রিক হার ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে। ক্ষতিকর কাজে যুক্ত বৃহত্তর শিশুশ্রমের হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে—২০১৩ সালে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে ২০২২ সালে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, গত দুই দশকে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়ায় কিছু উন্নতি হয়েছে, তবে বাংলাদেশ এখনো ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সঠিক গতিতে নেই। শ্রমে যুক্ত অধিকাংশ শিশু কাজ করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজন স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই প্রচেষ্টা।
এদিকে ইউনিসেফ এর আরেকটি প্রতিবেদনে জলবায়ুর ভয়াবহ প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে। ইউনিসেফ বলছে, দেশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৪৫ লাখ শিশু নিয়মিত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দ্বারা আক্রান্ত হয়।

শৈশব ফেরাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ: শুধু আইন করে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। দরকার পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বিকল্প কর্মসংস্থান, এবং উপকূলীয় অঞ্চলে শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা। 
 শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘এই মানুষগুলো কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এটা হওয়ার কারণে এবং স্কুল-কলেজগুলো যথেষ্ট দূরে, যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকার কারণে সে কিন্তু যেতে পারছে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...
https://slotbet.online/