দক্ষিণের চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাল তরমুজ। কোথাও গাছের পাশে সারি করে রাখা, কোথাও আবার মাটিতেই পড়ে আছে পাকা ফল।
দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে ফল তোলার মৌসুমের স্বাভাবিক ব্যস্ততা চলছে। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় ভিন্ন ছবি।
ক্ষেতের ধারে কয়েকজন কৃষক দাঁড়িয়ে আছেন নীরবে। তরমুজ আছে, কিন্তু নেই ক্রেতার ট্রাক। নেই সেই তাড়াহুড়ো করে ফল তোলার দৃশ্য।
বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা ও পিরোজপুরের বিভিন্ন তরমুজ চাষের এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, পাকা তরমুজের বড় অংশই এখনো ক্ষেতেই পড়ে আছে।
জ্বালানি সংকট, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও ট্রাকের অভাবে ঢাকাসহ বড় বাজারে ফল পাঠাতে পারছেন না অনেক চাষি।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, চলতি মৌসুমে বিভাগের ছয় জেলায় ৫৪ হাজার ২ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। এবার উৎপাদন ভালো হলেও পরিবহন সংকটে সেই ফলের বড় অংশই এখন মাঠে আটকে আছে।
দেশের মোট তরমুজ উৎপাদনের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে দক্ষিণাঞ্চল থেকেই।
সাধারণত রমজানের এই সময়টায় ট্রাকে করে এসব তরমুজ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। কিন্তু এবার সেই পথ যেন থমকে গেছে।
পদ্মা সেতুর পর বদলে যায় ধারা
এক সময় দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজ মূলত নৌপথেই ঢাকায় যেত। বরিশাল বা চাঁদপুর হয়ে লঞ্চ ও ট্রলারে ফল পৌঁছাতে সময় লাগত দুই থেকে তিন দিন।
পদ্মা সেতু চালুর পর সেই চিত্র দ্রুত বদলে যায়। ট্রাকে তুললেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকার বাজারে পৌঁছে যায় তরমুজ।
দ্রুত পরিবহন ও কম সময়ের কারণে কৃষক ও আড়তদাররা ধীরে ধীরে সড়কপথের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন।
বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কৃষক আবু জাফর বলেন, পদ্মা সেতুর পর প্রায় সব তরমুজই ট্রাকে পাঠাই। সকালে তুললে বিকেলেই ঢাকার বাজারে পৌঁছে যায়।
কিন্তু এখন বেশি টাকা দিয়েও ট্রাক পাচ্ছি না। তাই ছোট নৌকায় করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাতেও অনেক তরমুজ ক্ষেতেই পড়ে আছে। ঝড় হলে বড় ক্ষতি হবে।
নদীপথে সীমিত চেষ্টা
পরিবহন সংকটে কিছু কৃষক আবার নৌপথে বরিশাল শহরের বাজারে তরমুজ পাঠানোর চেষ্টা করছেন। তবে সেই পরিমাণ খুবই সীমিত।
দুই যুগ ধরে বরিশালে ফলের ব্যবসা করছেন গণেশ চন্দ্র দত্ত। দত্ত বাণিজ্যালয়ের মালিক তিনি। গণেশ দত্ত বলেন, ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জের শ্রীপুর, গলাচিপার হরিদেবপুর ও বাউফলের কালাইয়া বন্দর থেকে নৌপথে বরিশালে তরমুজ আসে।
মধ্য রমজানে প্রথম চালান ঢুকেছে। এরপর নিয়মিত আসছে। এখন সরবরাহ মোটামুটি থাকায় দামও হাতের নাগালে রয়েছে।
গণেশ দত্ত জানান, ভোলা, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের চরাঞ্চলের তরমুজের বড় অংশ নৌপথে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতীরের হাজীগঞ্জ বাজারে যায়।
আবার রাঙ্গাবালী চরাঞ্চলের তরমুজ নৌপথে কলাপাড়া ও গলাচিপার হরিদেবপুরে আসে। সেখান থেকে সড়কপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
ভোলার তরমুজ অনেক সময় লাহারহাট ফেরিঘাটে এনে সেখান থেকে ট্রাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
জ্বালানি সংকটে কমেছে ট্রাক
তবে চলতি মৌসুমে সড়কপথই এখন বড় সংকটে পড়েছে। স্থানীয় আড়তদার ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাক চলাচল কমে গেছে।
কৃষকদের হিসাবে, আগের বছর যে ট্রাকে তরমুজ ঢাকায় পাঠাতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা লাগত, এখন সেই ভাড়া ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অনেক সময় ভাড়া বেশি দিয়েও ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না।
এক কৃষক বলেন, ক্ষেতে তরমুজ লাল হয়ে আছে। কিন্তু ট্রাক নেই। যে ভাড়া চায়, তাতে বিক্রি করলেও লাভ থাকে না। আবার সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাবে কি না, সেটারও নিশ্চয়তা নেই।
বরিশালের একটি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক ফিরোজ হাওলাদার বলেন, গলাচিপা থেকে ঢাকায় একটি বড় ট্রাক যাওয়াুআসায় প্রায় ১৮০ লিটার জ্বালানি লাগে। নিয়ম অনুযায়ী ট্রিপের আগেই পুরো জ্বালানি নিতে হয়।
কিন্তু অনেক পাম্প থেকে এক হাজার টাকার বেশি জ্বালানি দিচ্ছে না। মহাসড়কের পাশে অন্তত ১৩টি পাম্প থাকলেও মাত্র তিনুচারটি পাম্প সীমিতভাবে জ্বালানি দিচ্ছে।
তার অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কায় কিছু পাম্প মালিক আগেভাগেই জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ফলে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও ট্রাক চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
ক্ষেতেই ঝুঁকিতে ফসল
তরমুজ বেশিদিন জমিতে রেখে দিলে তা ফেটে যেতে পারে বা পচে যেতে পারে। বৃষ্টি বা ঝড় হলে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়ে।
স্থানীয় চাষিরা বলেন, ‘আর কয়েকদিন যদি তুলতে না পারি, অনেক তরমুজ নষ্ট হয়ে যাবে। তখন পুরো খরচটাই ডুবে যাবে।’
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বিভাগের ছয় জেলায় ৫৪ হাজার ২ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে।
তবে এবার উৎপাদন ভালো হলেও পরিবহন সংকটে সেই ফলের বড় অংশই এখন মাঠে আটকে আছে।
https://slotbet.online/