জুন থেকে অক্টোবর ইলিশের ভরা মৌসুম। এ সময় জেলেদের মুখে হাসি ফোটার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এখন ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়ছে না। ফলে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলে পরিবারগুলোর।
হিজলার মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকার করা জেলে আব্দুস সালাম মাঝি বলেন, মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও কালাবদর নদী ইলিশের ভাণ্ডার। বিশেষ করে মেঘনা নদী ইলিশের অভয়াশ্রম। অথচ এখন এই নদীতেই ইলিশ নেই। সারাদিন জাল ফেলেও কোনো কোনো সময় একটি ইলিশও পাওয়া যায় না। ফলে উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। আড়তদারের কাছ থেকে ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। তবে সামনে টানা বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে নদীতে ইলিশ বাড়তে পারে।
মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা উজ্জ্বল বণিক বলেন, ইলিশের চলাচল অনেকটাই নদীর পরিবেশ, জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। আগামী দিনগুলোতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে ইলিশের পরিমাণ বাড়তে পারে বলে মৎস্য বিভাগ আশাবাদী।
এদিকে ইলিশের আহরণ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মাছঘাট ও আড়তগুলোতেও। ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন লোকসানের মুখে।
বরিশাল পোর্টরোড শহীদ জিয়াউর রহমান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার ইয়ার হোসেন শিকদার জানান, তাদের আড়তে মোট ১৭০ জন আড়তদার রয়েছেন। আগে ভরা মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার মণ ইলিশ আসত। বেচাকেনা ছাড়িয়ে যেত কোটি টাকা। মৎস্য শ্রমিক, পাইকার, আড়তদার ও ক্রেতাদের হাঁকডাকে পুরো মোকাম মুখর থাকত। কিন্তু এখন সেই চিত্র অতীত। এখন ভরা মৌসুমের শুরুতে দিনে ৩০ লাখ টাকাও বেচাকেনা হয় না।
বরিশাল পোর্টরোড মৎস্য আড়তের ইজিরাদার ও মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সিকদার বলেন, আগের মতো ইলিশ নেই। গত বছর ভরা মৌসুমে এ সময়ে যেখানে ২০০ থেকে ২৫০ মণ ইলিশ আসত, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে ১০ থেকে ২০ মণে। ইলিশের সংকট থাকায় এলসি সাইজের ইলিশের দাম প্রতি মণে এক লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। আর ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের মণ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকায়। নদীতে ইলিশ না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে কিছুদিন পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
একই চিত্র উপকূলীয় মাছঘাটগুলোতেও। মনপুরার রামনেওয়াজ ঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী মমিন তালুকদার বলেন, ভরা মৌসুমে সাধারণত ঘাট ইলিশে ভরে যায়। এবার সেই তুলনায় মাছ অনেক কম আসছে। ফলে ব্যবসায় মন্দা চলছে, দিন দিন লোকসান বাড়ছে।
এদিকে নদ-নদীতে ইলিশ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে জেগে ওঠা চরগুলোকে দায়ী করেছেন বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, নদীতে ইলিশ কম। এর কারণ নদী ও সাগরের মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থা। নদীতে বড় বড় ‘চর’ পড়েছে। এজন্য অতিরিক্ত স্রোত না থাকায় ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। এখন নদী শাসন বা ড্রেজিং জরুরি। বিষয়টি নিয়ে এরইমধ্যে আমরা একাধিক মিটিং করেছি। নদীর প্রবেশপথগুলো ড্রেজিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি। এটা করতে পারলে নদ-নদীতে ইলিশের আকাল দূর হবে।
সেই সঙ্গে ইলিশের পোনা ও জাটকা সংরক্ষণের ওপরও জোর দেন হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, বছরে আমাদের টার্গেট থাকে ৩৮ হাজার মেট্রিক টন বড় ইলিশ সংরক্ষণের। তবে এবার আমাদের সেই লক্ষ্য পূরণ হবে না। পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেট্রিক টন কম হতে পারে।
তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই জানিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, জুন থেকে ইলিশের প্রধান মৌসুম শুরু হলেও ভরা মৌসুম শুরু হয় জুলাই থেকে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ভারী বৃষ্টি হলে নদীতে ইলিশ আসবে এবং সংকট কাটবে বলে আশাবাদী এই কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, পদ্মা সেতু হওয়ার পর থেকে পাথরঘাটা, মহিপুর-আলীপুরের ইলিশ সোজা সড়ক পথে ঢাকায় যাচ্ছে। আবার ভোলার ইলিশ বেশিরভাগ যাচ্ছে চাঁদপুরে। ফলে গত কয়েক বছর ধরে যা আহরণ হচ্ছে তার থেকে খুব কম ইলিশই দক্ষিণাঞ্চলের বাজারগুলোতে পাওয়া যায়।
https://slotbet.online/