• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

আর্জেন্টিনা সবসময়ই চ্যাম্পিয়ন হতে মাঠে নামে : আলভারেজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ১১ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

জুলিয়ান আলভারেজের গল্পটা আসলে এক অসাধারণ রূপান্তরের গল্প। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে একজন মানুষ কতটা বদলে যেতে পারেন, কতটা বড় হয়ে উঠতে পারেন, সেটা বুঝতে হলে এ আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তিনি গিয়েছিলেন মূলত বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে। থাকার কথা ছিল রিজার্ভ বেঞ্চে। সেই আলভারেজ আজ আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

২০২৬ বিশ্বকাপের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি স্বপ্ন দেখছেন আরো বড় সাফল্যের। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছেন, আর্জেন্টিনা কখনো অংশগ্রহণের জন্য মাঠে নামে না, তারা সবসময় চ্যাম্পিয়ন হতেই মাঠে নামে। ফিফাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আলভারেজ বলেন, ‘আর্জেন্টিনা সবসময়ই চ্যাম্পিয়ন হতে চায় এবং এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।’ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে নতুন বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার অনুভূতিকে তিনি অবিশ্বাস্য বলে উল্লেখ করেছেন।

কাতার বিশ্বকাপের শুরুটা আর্জেন্টিনার জন্য ছিল ভয়াবহ। সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হার পুরো দেশকে হতবাক করে দেয়। সেই ম্যাচে আলভারেজ ছিলেন বদলি খেলোয়াড়। পরের ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষেও বেঞ্চ থেকেই নামতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু পোল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় গ্রুপ ম্যাচে প্রথমবারের মতো শুরুর একাদশে সুযোগ পান তিনি। সেদিন গোলও করেন। সেই ম্যাচের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। শেষ পর্যন্ত ফাইনাল পর্যন্ত নিজের জায়গা ধরে রাখেন এবং পুরো টুর্নামেন্টে চার গোল করে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।

বিশেষ করে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে করা তার জোড়া গোল এখনো বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই ম্যাচে তার গতি, প্রেসিং, বল কন্ট্রোল ও ফিনিশিং পুরো বিশ্বকে নতুন এক আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কাতারে তিনি শুধু গোল করেননি, বরং পুরো দলের কৌশলগত কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিলেন। স্কালোনির আর্জেন্টিনা যে উচ্চগতির চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করত, সেখানে আলভারেজ ছিলেন অন্যতম প্রধান অস্ত্র।

বর্তমানে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এ ফরোয়ার্ড। রিভার প্লেট একাডেমি থেকে উঠে আসা এই খেলোয়াড় ইতোমধ্যে কোপা লিবার্তাদোরেস, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং কোপা আমেরিকার মতো বড় শিরোপা জিতেছেন। ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই জায়গাতেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য নাম করে তুলেছে। এখন তিনি আতলেতিকো মাদ্রিদের অন্যতম প্রধান তারকা। অন্যদিকে লাউতারো মার্তিনেজ ইন্টার মিলানের আক্রমণভাগ নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে বিশ্বকাপজয়ী দলটির সামনে আক্রমণভাগে বিলাসী সমৃদ্ধি তৈরি হয়েছে।

তবে লাউতারোর সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন আলভারেজ। তিনি বলেছেন, দুজনই প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও একসঙ্গে খেলাটা তার জন্য আনন্দের। যখনই তারা একসঙ্গে মাঠে নেমেছেন, দল ভালো করেছে। আবার একজন খেললেও অন্যজনের লক্ষ্য থাকে দলের সাফল্য নিশ্চিত করা। তার মতে, সুস্থ প্রতিযোগিতা খেলোয়াড়দের আরো উন্নত হতে সাহায্য করে এবং সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা খেলবে গ্রুপ ‘জে’-তে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য গ্রুপটি তুলনামূলক সহজ মনে হলেও আলভারেজ কোনো প্রতিপক্ষকেই হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তার ভাষায়, বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। সামান্য ভুলও বড় মূল্য আদায় করতে পারে। তাই ধাপে ধাপে এগোনোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে জাতীয় দলের জার্সি মানেই বিশাল চাপ। দেশটির মানুষের কাছে ফুটবল কেবল খেলা নয়, এটি আবেগ, পরিচয় ও গৌরবের অংশ। আলভারেজ বলেছেন, এই জার্সি গায়ে চাপানো মানে পুরো একটি জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করা। এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করা, যেখানে মানুষ ফুটবল নিয়ে বাঁচে। তাই এটি যেমন গর্বের, তেমনি বড় দায়িত্বও। তবে সেই দায়িত্ব তারা ভালোবাসা ও আবেগ দিয়েই পালন করেন।

কাতার বিশ্বকাপের স্মৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আলভারেজ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচটির কথা। তার মতে, সেটিই ছিল পুরো টুর্নামেন্টের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া মুহূর্ত। সৌদি আরবের বিপক্ষে পরাজয়ের পর দলটি প্রচণ্ড চাপে ছিল। মেক্সিকোর বিপক্ষে হারলেই বিদায় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যেত। কিন্তু সেই ম্যাচে জয় পাওয়ার পর পুরো দলের মানসিকতা বদলে যায়। আলভারেজ মনে করেন, ওই ম্যাচের পর থেকেই তারা বুঝতে পারেন ভাগ্য এখন নিজেদের হাতেই এবং সেখান থেকেই সবকিছু ঠিকঠাক হতে শুরু করে।

বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারলে বর্তমান আর্জেন্টিনা দল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাতীয় দলে পরিণত হবে বলেও মনে করেন তিনি। কারণ, তখন তারা টানা দুই বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা জয়ের কীর্তি গড়বে। আলভারেজের মতে, গত কয়েক বছর আর্জেন্টিনার ফুটবলের জন্য ছিল এক স্বর্ণালী সময়। তাই এই যাত্রাকে আরো দীর্ঘ করতে চান তারা।

এ বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার একটি অবশ্যই লিওনেল মেসি। ২০২৬ আসরটি হয়তো হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ। বিষয়টি নিয়ে আলভারেজ বলেছেন, সবাই জানে বয়সের কারণে এটি সম্ভবত মেসির শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। তবে শেষ সিদ্ধান্ত মেসিরই। তিনি মনে করেন, শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্যই এটি বিশেষ একটি বিশ্বকাপ হবে। কারণ, ইতিহাসের সেরা ফুটবলারের বিশ্বকাপ যাত্রার শেষ অধ্যায় দেখার সুযোগ হয়তো আর আসবে না।

মেসির প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আলভারেজ বলেছেন, তার প্রভাব শুধু আর্জেন্টিনা নয়, গোটা বিশ্বজুড়েই বিস্তৃত। বর্তমান প্রজন্মের আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের জন্য মেসির সঙ্গে খেলা নিজেই একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। কাতার বিশ্বকাপে মেসিকে ঘিরে পুরো দলের আবেগ, দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাস ছিল আলাদা মাত্রার। সেই আবেগই হয়তো দলটিকে শিরোপা পর্যন্ত নিয়ে গেছে।

আলভারেজ নিজেও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্ব অনুভব করেন। কারণ, তিনি আর বেঞ্চের তরুণ ফুটবলার নন; বরং দলের মূল আক্রমণভাগের অন্যতম স্তম্ভ। তবে তিনি মনে করেন, তার খেলার ধরণ খুব বেশি বদলায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বেড়েছে, নতুন কিছু ধারণা শিখেছেন এবং কিছু জায়গায় উন্নতি করেছেন। গত কয়েক বছরে অসংখ্য বড় ম্যাচ খেলায় তার মানসিক দৃঢ়তাও বেড়েছে। তার মতে, আর্জেন্টিনার জার্সি পরলে খেলোয়াড়রা এমনিতেই অতিরিক্ত প্রেরণা পায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অজান্তেই আরো ভালো হয়ে ওঠে।

২০২৬ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার জন্য কেবল শিরোপা রক্ষার মিশন নয়, বরং একটি যুগের ধারাবাহিকতা রক্ষার লড়াইও। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। এরপর দলটি আবারও আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে। স্কালোনির অধীনে তারা শুধু শিরোপাই জেতেনি, বরং একটি সুসংগঠিত, লড়াকু ও মানসিকভাবে শক্তিশালী দল হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এ দলের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার ভারসাম্য। আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা জুলিয়ান আলভারেজদের মতো নতুন প্রজন্ম এখন হাল ধরছেন আলেবেসিলেস্তেদের।

বিশ্বকাপ ফুটবলে শিরোপা ধরে রাখা সবসময়ই কঠিন কাজ। ইতিহাসে খুব কম দলই এটি করতে পেরেছে। কারণ, একবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর পুরো বিশ্বই তাদের হারানোর জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু আলভারেজদের কথায় স্পষ্ট, তারা সেই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...
https://slotbet.online/