কীর্তনখোলা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিশ গোডাউন কম্পাউন্ডের এই বধ্যভূমি একসময় শুধু স্মৃতির স্থান ছিল না, ছিল অনুভবের এক দরজা।
ভেতরে পা রাখলেই যেন সময় পিছিয়ে যেত, দেখা মিলত দেয়ালের গায়ে লুকিয়ে থাকা ১৯৭১-এর ইতিহাসের ছাপ।
টর্চার সেলের অন্ধকার কোণ আর নতুন করে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেমে ভেসে আসা আর্তনাদ মিলিয়ে তৈরি হতো এক গভীর আবহ।
সেখানে নতুন প্রজন্মের দর্শনার্থীরা কেবল ফ্রেমে বাঁধা স্মৃতি দেখতেন না, বরং হৃদয়ের গভীরে অনুভব করতেন স্বাধীনতার দাম কতটা রক্তের বিনিময়ে লেখা।
কিন্তু সেই অনুভবের জগৎ এখন ভাঙা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভাঙচুর আর লুটপাটে বদলে গেছে পুরো চেহারা। সাউন্ড সিস্টেম আর শোনা যায় না, আলো জ্বলে ওঠে না আগের মতো।
যেসব সরঞ্জাম একসময় ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলত, সেগুলো নেই বললেই চলে। অনেক কিছুই লুটপাট হয়েছে।
এখন সেখানে দাঁড়ালে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা চোঁখে দেখা যায় না, কিন্তু গভীরভাবে টের পাওয়া যায়। মনে হয়, এই জায়গাটির ভেতরে জমে থাকা স্মৃতিগুলো যেন আর উচ্চারণ করতে পারছে না নিজেদের কথা। আগস্টের পরে ভাংচুরে বধ্যভূমির প্রতিটি স্মৃতি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।
প্রবেশপথেও সেই পুরোনো স্বাচ্ছন্দ্য নেই। অসম্পূর্ণ ওয়াকওয়ে, নিচে নেমে ঢোকার বাধ্যবাধকতা, আর নিরাপত্তার ঘাটতি। এই সব মিলিয়ে দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতা যেন থমকে যায় শুরুতেই।
যে স্থানে প্রবেশ করা একসময় ছিল এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি, সেখানে এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে একধরনের দ্বিধা। তৈরী হয়েছে অজানা ভয়। সেই ভয় এখনো রয়ে গেছে।
মুক্ত চিন্তার মানুষগুলোর আর পা পড়ে না বধ্যভূমির দরজায়। বন্ধ দরজা, তাই ভেতরে ধুলো জমে আছে। সেই ধুলো পরিস্কার কিংবা সংস্কারের অর্থ নেই বরিশাল সিটি করপোরেশনের তহবিলে।
এই বধ্যভূমি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের নিদর্শন নয়, বরং বরিশালের ইতিহাসের এক গভীর অধ্যায়। কীর্তনখোলার তীর, যেখানে একসময় গণকবরের নীরবতা জমে ছিল।
সেখানে আজও যেন অতীতের ছায়া ভেসে বেড়ায়। সেই ছায়াকে ধারণ করেই গড়ে উঠেছিল সংরক্ষণ প্রকল্প, যাতে নতুন প্রজন্ম অন্তত ছুঁয়ে দেখতে পারে ইতিহাসের বাস্তবতা।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই এলাকাকে বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরে বরিশাল সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয় অব এশিয়া প্যাসিফিক, বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সহযোগিতায় এটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
মুক্তিযোদ্ধা এ এম জি কবীর ভুলু ওয়াপদা কলোনির পাকিস্তানি টর্চার সেল থেকে বেঁচে ফেরা একজন যুদ্ধাহত যোদ্ধা। ১৯৭১ সালে তিনি সেখানে ১৯ দিন অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন এবং পরে আরও ৭১ দিন কারাগারে বন্দী ছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পর আবারও তিনি রণাঙ্গনে ফিরে যান।
মুক্তিযোদ্ধা এ এম জি কবীর ভুলু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনায় হামলার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বধ্যভূমি ও টর্চার সেল কমপ্লেক্সের স্মৃতিস্তম্ভসহ অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কার করে এর মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী জানান, বধ্যভূমি ও স্মৃতি কমপ্লেক্সটির সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে তহবিল সংকটের কারণে এখনো কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। অর্থের সংস্থান হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থাপনাটির সংস্কার করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বরিশালের এই বধ্যভূমি তাই এখন এক দ্বন্দ্বের ভেতরে দাঁড়িয়ে। একদিকে ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বাস্তবতার অবহেলা। যে স্থাপনা একসময় মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করত।
সেখানে আজ থমকে আছে সময় নিজেই। আর সেই থমকে থাকা সময়ের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে একেকটি স্মৃতি, একেকটি সাক্ষ্য।
https://slotbet.online/