১৩ জমিদারের বসতভিটা কলসকাঠী। ১৭ শতকের ঐতিহাসিক গ্রামটি একসময় পরিচিত ছিল সংস্কৃতিচর্চার জন্য। যখন জমিদারি প্রথা নেই, তখনও সেখানে সাংস্কৃতিক রেওয়াজ টিকে ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি শুক্রবারের বিকেল ছিল আলাদা।
দূর থেকে ভেসে আসতো তবলার বোল, সেই তালে তাল মিলিয়ে বসে থাকতো কিশোরেরা। তাদের মাঝখানে বসে থাকতেন একজন মানুষ। নাম তার প্রতাপ কুমার চন্দ, তবে সবার কাছে ‘ভুলু’ নামেই পরিচিত। এখন সেই তবলার বোল নেই।
দরজা বন্ধ, কক্ষ খালি। ভুলুর জীবনও অনেকটা থমকে গেছে। ভুলু শুধু একজন তবলা বাদক নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। তার বাবা জ্ঞান চন্দ ছিলেন কলসকাঠীর পরিচিত সাংস্কৃতিক সংগঠক। তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে ওই এলাকার জ্ঞানচন্দ সংগীত বিদ্যালয়’।
১৯৯১ সালে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী অধ্যক্ষ ইউনুস খান এই বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন। সেই থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঘিরেই নিজের জীবন গড়ে তুলেছিলেন ভুলু। কিন্তু শুরুর পথটা সহজ ছিল না। কলসকাঠি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি ছোট কক্ষে শুরু হয় সংগীতচর্চা। পরে কখনো সমবায় সমিতির ঘর, কখনো কারো বাসার একটি কক্ষ। স্থান বদলেছে বারবার, কিন্তু থেমে থাকেনি শেখানো।
বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং তার ভাই ডা. দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর বাসভবনের একটি কক্ষেও চলেছে এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। এরপর হাতেম আলী হাওলাদারের ভাড়া বাসা।
শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালে প্রশাসনের সহায়তায় কৃষি বিভাগের একটি বীজ সংরক্ষণ গুদামের কক্ষে স্থায়ীভাবে জায়গা মেলে। সেখানেই টানা এক দশক বিনা ভাড়ায় চলেছে সংগীত শিক্ষা। প্রতি শুক্রবার বিকেলে অন্তত ৩৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে জমে উঠতো ক্লাস।
কিন্তু সময় হঠাৎ বদলে যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই কক্ষ ছেড়ে দিতে হয়। বিকল্প কোনো জায়গা মেলেনি। এক দিনেই থেমে যায় বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা সংগীতচর্চার সেই আসর।
এদিকে, এই বিদ্যালয়ই ছিল ভুলুর জীবনের কেন্দ্র। এখানেই তার দিন শুরু, এখানেই তার পরিচয়। তবলার প্রতিটি তাল, প্রতিটি বোল শুধু সংগীত নয়, ছিল তার জীবিকার ভাষা। ভুলু বলেন, ‘ছেলে-মেয়েগুলো প্রতি শুক্রবার আসতো। কেউ প্রাইভেট শেষে, কেউ দূর থেকে। এখন আর কেউ আসে না। আমি বসে থাকি, কিন্তু শেখানোর জায়গা নেই।’
এই থেমে যাওয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, থেমে গেছে কয়েকজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নও। যারা প্রথমবার তবলার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল ভুলুর হাত ধরেই।
ভুলুর জীবিকা ছিল ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি সংগীত বিদ্যালয়ের ওপর। প্রতি শুক্রবার সকালে বাক্গেঞ্জ সোনালী ব্যাংকের দোতলায় আগাবাকের সাংস্কৃতিক সংঘে তবলা বাজাতেন। আর প্রতি শনিবার কালীগঞ্জ বাজার ও বোয়ালিয়ায় ক্লাস নিতেন। বৃহস্পতিবার দারিয়াল ইউনিয়নের কামারখালী শিশু নিকেতন ও পূজাখালী বাজারে শিশুদের শেখাতেন।
এ ছাড়া মির্জাগঞ্জের কাঠালতলী ও রামপুরেও দীর্ঘদিন তালিম দিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগেই লাগাতার ধর্মঘটের কারণে এই দুটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তার আয়ে টান পড়ে। কারণ এই ছড়িয়ে থাকা কাজগুলোই ছিল তার আয়। একেকটি জায়গা মানে একেকটি ছোট উপার্জন, আর সব মিলিয়ে সেটাই ছিল সংসারের ভরসা। এখন সেই দরজাগুলোও প্রায় বন্ধ।
ভুলু বলেন, ‘আমি তো আর অন্য কিছু পারি না। এই তবলাই আমার সব। জায়গা না থাকলে শেখাব কোথায়?’
তার প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কলসকাঠীর মানুষ জানে, মানুষটি শুধু নিজের জন্য বাজাননি। ভুলু প্রজন্মের পর প্রজন্মকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন।তার কাছ থেকে শিখে অনেকেই আজ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাজান, কেউ কেউ পেশাদার সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
একটি ছোট কক্ষ, কয়েকটি মাদুর আর কিছু তবলা-এইটুকুই তার দরকার। কিন্তু সেইটুকু জায়গার অভাবে থেমে আছে একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, থমকে আছে একজন মানুষের জীবিকা। কলসকাঠীর নিঃশব্দ বিকেলগুলো এখন যেন অপেক্ষায়। আবার কবে ভেসে আসবে সেই তবলার শব্দ।
https://slotbet.online/