বরিশালকে বলা হয় পানির দেশ। মাকড়সার জালের মতো এ জনপদকে জড়িয়ে রেখেছে নদী-খাল আর জলাশয়। তবে পাঁচ-ছয় বছর ধরে অঞ্চলটিতে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। উপরিভাগে পর্যাপ্ত উৎস থাকলেও খাবার পানির জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে নগরের কয়েক লাখ মানুষকে। নগরে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি লিটার পানির চাহিদা থাকলেও ৩৫ হাজার গ্রাহককে ২ কোটি ৯০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করছে সিটি করপোরেশন। সরবরাহ করা পানিতে লবণাক্ততা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নগরবাসী। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ২০১৬ সালে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় দুটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। তবে নানা জটিলতায় চালু হয়নি প্লান্ট দুটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া উচিত। অবশ্য পানির ঘাটতি পূরণে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।
সিটি করপোরেশনের পানি শাখার তথ্য বলছে, প্রায় সাড়ে চার লাখ নগরবাসীর জন্য পাঁচ লাখ গ্যালন বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র তিন লাখ গ্যালন। এ অবস্থায় নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে কীর্তনখোলা নদীর তীরে বেলতলায় ২০১২ সালে প্রায় ১৯ কোটি টাকা এবং রূপাতলীতে ২০১৩ সালে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কাজ শুরু হয়। ২০১৬ সালের জুনে ওই দুটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। প্লান্ট দুটির মাধ্যমে নগরের বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর হওয়ার কথা। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় নয় বছরেও পানি শোধনে যেতে পারেনি প্লান্ট দুটি।
এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার মো. রায়হান কাওছার বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকট মেটাতে অচিরেই চালু হচ্ছে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দুটি। বিকল প্লান্ট সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছে, যার মধ্যে ৮ কোটি টাকা ব্যয় করে এগুলোকে সচল করার কাজ চলমান রয়েছে। যার একটি অক্টোবরের শেষ নাগাদ এবং অন্যটি নভেম্বরের মধ্যে চালু হবে। এগুলো পুরোপুরি ফাংশনে গেলে ৩৬০ কোটি লিটার পানি প্রতিদিন নদী থেকে সারফেস করে ব্যবহার উপযোগী করা যাবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অর্ধেকে নেমে আসবে। এরই মধ্যে নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে আরো একটি ওয়াটার সারফেস প্লান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
নগরবাসী বলছেন, নগরবাসীর সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। নির্মাণকাজ অনেক আগে শেষ হলেও এখনো প্লান্ট দুটি চালু হয়নি। বলা হয়েছিল এখান থেকে নগরীর পানির চাহিদা মেটানো হবে। কিন্তু নির্মিত প্লান্টের সুফল ভোগ করতে পারছেন না নগরবাসী। এছাড়া সিটি করপোরেশনের সরবরাহ করা সুপেয় পানিতে লবণাক্ততার আধিক্য রয়েছে। পানি মুখে নিলেই সেটা বোঝা যাচ্ছে।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম খান রাজন বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে দ্রুত প্লান্ট দুটি চালুর উদ্যোগ নেয়া উচিত। শুকনো মৌসুমে গভীর নলকূপগুলোতে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাওয়ায় নগরজুড়ে স্থাপন করা গভীর নলকূপগুলো থেকেও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে দিন দিন বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট।’
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ১ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করার কথা ছিল। তবে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর সময় সরবরাহ হয় মাত্র ২৫ লাখ লিটার পানি। সে সময় দেখা দেয় নানা ত্রুটিও। নির্মাণ সংস্থা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের পাল্টাপাল্টি দোষারোপে এরপর আর চালু হয়নি প্লান্ট দুটি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নামছে। ১০ বছর আগেও যেখানে ২০ ফুট নিচে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পাওয়া যেত, সেখানে এখন নেমে গেছে ৪০-৫২ ফুট নিচে। ফলে বিকল হয়ে পড়েছে কয়েকশ নলকূপ।
https://slotbet.online/