এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/ তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বত্সরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/ যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক…। নতুনের আবাহনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরায়ত সুর বাঙালির প্রাণে প্রাণে দ্যোতনা তুলবে আজ।
প্রভাতের অগ্নিচ্ছটায় আবহমান এ বাংলার দিগিদগন্ত উদ্ভাসিত করে আজ এলো নতুন দিন। আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে শূচি করে তুলতে আবার এসেছে বৈশাখ। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩। ‘আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে’ বাঙালির কায়মনো প্রার্থনা :‘যা কিছু ক্লেদ, গ্লানি পাপ মূঢ়তা, যা কিছু জীর্ণ-শীর্ণ-দীর্ণ, যা কিছু পুরাতন তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই।’
বর্ষবরণের উত্সবের আমেজে মুখরিত আজ বাংলার চারদিক। গাছের পাতার ফাঁক গলে প্রখর রোদ জানান দিচ্ছে প্রকৃতি নিজেই খুলে দিয়েছে বৈশাখের দুয়ার। বৈশাখের প্রতীক কৃষ্ণচূড়ার ডালেও লেগেছে আগুন। ঝড়-বৃষ্টির দামামা বাজিয়ে, ধুলাবালির মেঘ উড়িয়ে, বজ্রের গগনদীর্ন গর্জনে কাঁপিয়ে বৈশাখ অধিকার করে নেবে দশ দিক। প্রকৃতিতে জাগবে প্রলয়নাচন। বাতাস পাবে উদ্দামতা, প্রকৃতি হয়ে উঠবে রুক্ষ-রুদ্র-শুষ্ক-খর। আকাশে ঝলকাবে বিদ্যুত্বহ্নি, ঈশান-দুয়ার খুলে পশ্চিমা ঝড় দৈত্য সৈন্যের মতো ধেয়ে আসবে বাংলার জনপদে-বসতিতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় :বৈশাখে বিদ্যুত্-চঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে আসা কালো শ্যেনপাখির মতো প্রলয়ংকরী ঝড় ধেয়ে আসবে বাংলার গ্রাম-গঞ্জে নগর-বন্দরে। এই গ্রীষ্মের অগ্নিবাণে প্রাণী, বৃক্ষলতা, গুল্ম, মৃত্তিকায় জাগে তৃষ্ণা। সেই আকুল নিদাঘ তিয়াষা ঘোচাতে বজ্রের রথে চেপে আসে প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী। ঘন কৃষ্ণ মেঘরাশির গুরুগম্ভীর গর্জনে আকাশ যেন ভেঙে পড়ে জলপ্রপাতের ছন্দোময় বর্ষণধারায়। বাংলার প্রকৃতি আবার হয়ে উঠবে উর্বর সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা।
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়…।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই সুর-ধ্বনির ভেতর দিয়েই বাঙালি নতুন বছরে সব অপ্রাপ্তি ভুলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। দুনিয়া কাঁপানো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেড় দশকের দানবীয় স্বৈর সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের নব-পটভূমিতে আজ দেশের মানুষ উদ্যাপন করবেন বাংলা নববর্ষ। নব আঙ্গিকে-নব উত্সবে ঘিরে থাকবে দেশ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিজয়ের আবহেই এসেছে এবারের পহেলা বৈশাখ। চারদিকে উত্সবের রং, মুখে মুখে শুভেচ্ছা, কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে এক আশার বার্তা। আজ দিকে দিকে ছড়িয়ে যাবে বদলে যাওয়ার, নতুন দেশ গড়ে তোলার বার্তা। নতুন বছরে বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখবে একটি আলোকিত ভবিষ্যতের।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে দেশবাসীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সরকারি ছুটির দিন। পত্রপত্রিকা আজ প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সেসঙ্গে আছে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নানা আয়োজন, ব্যবসায়ীদের হালখাতা।
কৃষির সঙ্গে বাংলা নববর্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই সন প্রবর্তনের সূচনা থেকেই। মোগল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন বাংলা সনের। এর আগে মোগল বাদশাহগণ রাজকাজে ও নথিপত্রে ব্যবহার করতেন হিজরি সন। হিজরি চান্দ্র বছর, যা ন্যূনধিক ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয়। কিন্তু সৌর বছর পূর্ণ হয় ন্যূনধিক ৩৬৫ দিনে। বছরে প্রায় ১১ দিনের পার্থক্য হওয়ায় হিজরি সন আবর্তিত হয় এবং ৩৩ বছরের মাথায় সৌর বছরের তুলনায় এক বছর বৃদ্ধি পায়। ফসল উত্পাদনের ঋতুর ভিত্তিতে কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে সারা দেশে একটি অভিন্ন সৌর বছরের প্রয়োজন। এই ধারণা থেকেই সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখার নাম থেকে। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উত্সব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃৃত হয়। রূপান্তরিত হয় লোকজ উত্সবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরোনো উত্সবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে, অনেক নতুন উত্সবের।
https://slotbet.online/