বরিশাল অঞ্চলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণাধীন ৭৮ টি সেচ পাম্প হাউজ দীর্ঘদিন ধরে অচল ও পরিত্যক্ত হয়ে আছে। আর এসব পাম্প হাউজের ইঞ্জিন ও পাইপ বিক্রি করে লোপাট করেছে তৎকালিন পাউবোর অসাধু কর্তা ব্যক্তিরা। ফলে কৃষকরা সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে অতিরিক্ত খরচে ব্যক্তিগত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ধানসহ মৌসুমি ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আসছে।
এই সেচ পাম্প হাউজ গুলোর আওতায় বরিশাল বিভাগের ৭ উপজেলার ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫ হেক্টর জমি চাষাবাদে হয়ে আসছিলো। বর্তমানে এই জমি কৃষককরা নিজেদের ব্যক্তি উদ্যোগে পাম্প চালিয়ে চাষাবাদ করলেও সরককারের কোটি কোটি টাকায় স্থাপিত পাম্প হাউজ গুলো পরিত্যক্ত। যা দেখার কেউ নেই বল্লেই চলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন স্থানে পাম্প হাউজগুলোর পুরোনো ইঞ্জিন, পাইপলাইনের পাইপ এবং যন্ত্রাংশ মরিচা ধরে অচল হয়ে পরে কয়েক যুগ আগেই। কোথাও আবার ভবন ভেঙে পড়েছে, দরজা-জানালা নেই যা দেখলে মনে হয় বহুদিন ধরে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি।
ঈাউবো বরিশালের একটি সূত্র জানায়, ২০১০ সাল নাগাদ বরিশাল পাউবোর অসাধু ব্যক্তিরা তা খুলে বিক্রি করে দেয়। এইসকল যন্ত্রাংশ ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করা টাকার কোন হদিস জানে না বর্তমান দ্বায়ীত্বরতরা। তারা বলছেন সেকালের বিষয় আমরা অবগত নই। তবে এখন সরকার এই পা¤প হাউজ গুলো নতুন করে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫ টি পাম্প হাউজ নতুন করে চালু করা হয়েছে। আরো ২১ টি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে পাউবো কতৃপক্ষ।
কৃষকরা অভিযোগ করেন, সরকারি পাম্প হাউজ চালু থাকলে সেচের খরচ কম হতো। বর্তমানে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহারে ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বরিশাল সদর উপজেলার কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ডিজেলের দাম বেশি। জমিতে পানি দিতে এখন আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ খরচ হয়। তবুও সরকারি পাম্প হাউজ আছে তবে ফাকা। মেশিন বা যন্ত্রাংশ কিছুই নেই। পরিত্যাক্ত পওে আছে পাম্প হাউজ গুলো।
কৃষকদের প্রত্যাশা সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে, যাতে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ অবহেলায় নষ্ট না হয় এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দূর হয়।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭৫ ও ৮৫ সালের দিকে বরিশাল বিভাগের ৭ উপজেলায় কৃষি উন্নয়নে সরকার বরিশাল ইরিগেশন প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্পের অধিনে ৭৮টি পাম্প হাউজ স্থাপন করে। বরিশাল সদও উপজেলায় ১৬টি, বাবুগঞ্জে ১৪টি, বাকেরগঞ্জে ১২ টি, নলছিটিতে ১৪ টি, ঝালকাঠি সদরে ১৪ টি, রাজাপুরে ৭ টি ও কাউখালীতে ১ টি পাম্প স্থাপন করে। ফলে তখন এই অঞ্চলে ব্যাপক সাড়া ফেলে ছিলো কৃষিতে। পরবর্তিতে পাম্পের ইঞ্জিন এর যন্ত্রাংশ বিকল রক্ষনা বেক্ষনের অভাবে তা পরিত্যাক্ত হয়ে পরে। যদিও কর্মকর্তারা বলছেন সরকার পুনরায় এই সকল পাম্প হাউজেই নতুন গ্রাফিটিতে উন্নিত করে বিদ্যুৎ চালিত পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে ১৮টি চালু করা হয়েছে। বাকি গুলো পর্যায় ক্রমে চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিগ্রই আরো ২১ টি পাম্প চালু করা হবে। তবে ধাপে ধাপে অচল পাম্পগুলো সংস্কার করে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তাঁরা।
কৃষি বিভাগ মনে করে সঠিক সময়ে সেচ নিশ্চিত না হলে বোরো ও আমন মৌসুমে উৎপাদন কমে যাবে, যা স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তার উপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির বিস্তার আরও বাড়ায় সরকারি সেচ ব্যবস্থা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে স্থাপিত পাম্পের সক্ষমতা ২৫ কিউসেফ। প্রতি সেকেন্টে ৭ শত লিটার পানি উঠাতে সক্ষম একটি পাম্প। আর এই পাম্প কৃষকদের মাঝে লোকাল সংগঠনের মাধ্যমে পাম্প হাউজ থেকে পানি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ডিজেলে নিজেস্ব পদ্বতিতে একরে যে খানে খরচ হয় ৭৫০০ টাকা আর সেখানে পাউবোর গ্রাফিটি পাম্পের মাধ্যমে সেচ দিলে খরচ হবে মাত্র ২ হাজার টাকা।
সরকারিভাবে নির্মিত এসব পাম্প হাউজ একসময় বরিশাল অঞ্চলের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশই অযত্নে পড়ে থাকায় বিশাল অংকের সরকারি বিনিয়োগ আজ অবহেলায় ধ্বংসের পথে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বরিশালের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এবিষয়ে আলাপকালে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবোর) অতি: প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ শাহিদুল আলম বলেন, পাম্প হাউজগুলোর পরিত্যক্ত হওয়া বা অচলাবস্থার বিষয়টি জানা আছে। বাজেট সীমাবদ্ধতা ও যন্ত্রপাতি সংকটের কারণেই প্রায়ই সংস্কারকাজ বিলম্বিত হয়। সরকার ২ শত ৩৯ কেটি টাকার একটি প্রকল্প হতে নিয়েছ। আশা করি ধাপে ধাপে নতুন করে পাম্প স্থাপন করে হাউজ গুলো চালু করা হবে।
https://slotbet.online/