মেঘের মাদল বাজিয়ে অবসান হলো জ্যৈষ্ঠের রুদ্ররূপের। তপ্ত ধরণীর বুক চিরে অবশেষে নামলো আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি। আর সেই বৃষ্টিতে কোলাহল ভুলে আনন্দে মেতেছে মানুষ। তীব্র খরা আর হাঁসফাঁস করা দাবদাহ শেষে আষাঢ়ের এই প্রথম বর্ষণ যান্ত্রিক নগর জীবনকে এক নিমেষেই করে তুলেছে স্নিগ্ধ, ও শীতল। প্রকৃতির এই রূপ ছুঁয়ে গেছে বরিশালের প্রতিটি স্থান। বর্ষার এই চিরচেনা রূপকে বরণ করে নিতে জীবনানন্দের দাসের রূপসী বরিশাল মেতেছিল এক অন্যরকম উৎসবে।
সোমবার রাতে সংগীত, নৃত্য, গল্প আর রসনা বিলাসের এক মায়াবী আয়োজন বসেছিলো নগরীর নতুন বাজার এলাকার বনলতা বুক ক্যাফেতে। আষাঢ়ের প্রথম দিনটিকে স্বাগত জানিয়ে বর্ষা বরণ অনুষ্ঠানে তরুণীরা নিজেদের সাজিয়েছিলেন নীল শাড়িতে। মেতেছিলেন বৃষ্টি নিয়ে জমানো হাজারো স্মৃতি চারণে।
অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসফিয়া রহমান নাবিলা খোপায় কদম ফুল গুঁজে স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, কংক্রিটের এই ব্যস্ত শহরে এখন আর আগের মতো বৃষ্টি উপভোগ করা হয় না। কিন্তু আজকে নীল শাড়ি পরে, বন্ধুদের সাথে এই আষাঢ়ে আড্ডায় এসে মনে হচ্ছে শৈশবের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে পেয়েছি। রিমঝিম বৃষ্টির শব্দ আর কদম ফুলের সুবাস- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছে।
বর্ষা বরণ উৎসবে শামিল হওয়া আরেক তরুণী নুসরাত জাহান মিম তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, আষাঢ়ের প্রথম দিন মানেই আমার কাছে এক টুকরো নীল আকাশ আর কদম ফুল। ক্যাফের এই মায়াবী পরিবেশে এসে মনে হচ্ছে মেঘের দেশে হারিয়ে গেছি। শৈশবে বৃষ্টিতে ভেজার যে আনন্দ, আজ যেন এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সেই নস্টালজিয়া আবার নতুন করে ছুঁয়ে গেল।
বর্ষার চিরন্তন রূপকে ভালোবেসে এই আড্ডায় যোগ দিয়েছিলেন পেশাজীবী নারী ফারজানা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, কর্মব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে আমরা উৎসবের আনন্দগুলো ভুলেই যাই। কিন্তু এই চমৎকার আয়োজনটি আমাদের আবার বাঙালি সংস্কৃতির কাছে ফিরিয়ে এনেছে। বৃষ্টি যেমন তপ্ত ধরণীকে শীতল করেছে, তেমনি আমাদের মনকেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিয়েছে।
জলবায়ুর হিসেব-নিকেশ যাই হোক না কেন, আষাঢ়ের প্রথম দিনে বাঙালির মেঘ-পিওনেরা যে পথ ভুলো হয় না কখনোই, সেটিই যেন প্রমাণ করল এই নান্দনিক উৎসব। ইট-পাথরের এই ব্যস্ত শহরে নতুন প্রজন্মের কাছে বর্ষার সত্যিকারের অনুভূতি ও বাঙালি সংস্কৃতির চিরন্তন রূপকে পৌঁছে দিতেই এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
বর্ষা বরণ অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক ও বনলতা বুক ক্যাফের পরিচালক জাহিদ আবদুল্লাহ রাহাত জানান, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম সুন্দর ও রোমান্টিক অনুষঙ্গ হলো বর্ষা উৎসব। আধুনিকতার ভিড়ে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের ঋতুবৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন আর আষাঢ়-শ্রাবণের চিরন্তন রূপ বা এর সাংস্কৃতিক গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা চেয়েছি এই ইট-পাথরের নগরে তরুণ-তরুণীদের একটুখানি প্রকৃতির ছোঁয়া দিতে, তাদের শেকড়ের সন্ধান দিতে। তরুণীদের নীল শাড়ি আর তরুণদের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসই জানান দেয়, বাঙালি তার সংস্কৃতিকে কতটা গভীরভাবে ভালোবাসে।
বর্ষা বরণ অনুষ্ঠানে বরিশালের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, গবেষক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এ রকম আরো সংবাদ...