জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। তার স্মৃতি সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে বাবুগঞ্জ উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। তবে এখন সেটি কার্যত নামসর্বস্ব জাদুঘরে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাদুঘর নাম থাকলেও সেখানে নেই বীরশ্রেষ্ঠের ব্যবহৃত কোনো স্মারক, যুদ্ধকালীন কোনো নিদর্শন কিংবা তার জীবনের উল্লেখযোগ্য কোনো সংগ্রহ।
বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৪৫ সালের ৬ মার্চ বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে মুলাদী মাহবুদজান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। ওই বছরই তিনি ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন লাভ করেন এবং ১৭৩ মূলতান ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নে যোগদান করেন। ছয় মাস পর তাকে রিসালপুর মিলিটারি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বদলি করা হয়।
বরিশালের নিজ গ্রামের নাম তার পরিবার ও গ্রামবাসীর ইচ্ছা অনুসারে তার ইউনিয়নের নাম ‘আগরপুর’ পরিবর্তন করে ‘মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর’ ইউনিয়ন করা হয়েছে। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বরিশাল জেলা পরিষদ ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের দান করা ৪০ শতাংশ জায়গার ওপর ২০০৮ সালে নির্মাণ করে বীর শ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার।
একসময় ইতিহাসপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। কিন্তু জাদুঘরটিতে কোনো প্রদর্শনী নিদর্শন না থাকায় ক্রমেই দর্শনার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নেন। এখন ঈদ ছাড়া তেমন কোনো দর্শনার্থীর দেখে মেলে না এই জাদুঘরে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জাদুঘরের ভবন থাকলেও ভেতরে জাদুঘর সুলভ কোনো প্রদর্শনী নেই। কিছু বই ও সাধারণ তথ্যচিত্র ছাড়া দর্শনার্থীদের জন্য তেমন কিছুই উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে আগ্রহী শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই প্রতিষ্ঠানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংগ্রহশালা গড়ে তোলার উদ্যোগের অভাবে এটি তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
সাফওয়ান খান নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘জাদুঘরের নাম শুনে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম বীরশ্রেষ্ঠের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, ছবি, দলিল বা যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে পাব। কিন্তু এসে দেখি তেমন কিছুই নেই।’
সৈয়দা রাবেয়া নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, জাদুঘরের কথা শুনে বরিশাল থেকে ৩২ কিলোমিটার ভাঙাচোরা আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু এসে পুরোই হতাশ হয়েছি। নামেই জাদুঘর কিন্তু, ভিতরে জাদুঘরের কোনো নিদর্শনই নেই। পুরো ভবনটির মধ্যে শুধু কিছু বই সাজিয়ে রাখা রয়েছে। এছাড়া বীরশ্রেষ্ঠের ব্যবহৃত কোনো জিনিসপত্র বা যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন নেই।’
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল সোহেল বলেন, বর্তমানে জাদুঘরটির বেহাল অবস্থা এবং সেখানে পৌঁছানোর রাস্তাঘাটের দুর্দশার কারণে দর্শনার্থীদের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের স্মৃতিকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা। জাদুঘরে তার জীবনী, ব্যবহৃত সামগ্রী, যুদ্ধকালীন দলিল, আলোকচিত্র এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তথ্যসমৃদ্ধ প্রদর্শনী যুক্ত করা উচিত।
দর্শনার্থীদের মতে, দ্রুত রাস্তাঘাট সংস্কার এবং জাদুঘরের আধুনিকায়ন করা হলে এটি আবারও ইতিহাসচর্চা ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের অবদানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই স্মৃতি জাদুঘর শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি জাতির বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ যথাযথ পরিচর্যা ও উন্নয়নের অভাবে এর গুরুত্ব দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নটি সংরক্ষণ করা। যাতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ পুনরায় ফিরে আসে।
বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর গ্ৰন্থাগর ও স্মৃতি জাদুঘরের কেয়ারটেকার মো. হাফিজুর রহমান মিলন বলেন, আগে বিভিন্ন সময়ে লোকজন আসতো জাদুঘর ঘুরে দেখতো। কিন্তু বর্তমানে এখানে আসার রাস্তা ও জাদুঘরের দুরবস্থার কারণে লোকজনের তেমন একটা আনাগোনা নেই। তাছাড়া জাদুঘরে কিছু বই ছাড়া দেখার মতো কিছুই নেই।
তিনি আরও বলেন, এখানে তার স্মৃতিচিহ্ন বলতে রয়েছে শুধু তার ব্যবহার করা একটি চায়ের কাপ ও একটি ব্যাগ। এছাড়া অন্যান্য নিদর্শন সব ঢাকা জাদুঘরে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, আসলে ওনার (বীরশ্রেষ্ঠ) পরিবারের সদস্যরা তেমন কিছু সংরক্ষণ করে দিতে পারেনি। তাই যা পাওয়া গেছে সেগুলোই সংরক্ষণ করা আছে। ভবিষ্যতে যদি কিছু পাওয়া যায় তাহলে সেগুলো সংরক্ষণ করা হবে।
https://slotbet.online/