• শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

খুঁটিতে বাঁধা বাবার মুখে রুটি তুলে দেওয়া ছোট্ট তুবাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন ইউএনও

স্টাফ রিপোর্টার / ৫ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

চুরির অপবাদ দিয়ে অমানুষিক নির্যাতনের পর খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা বাবার মুখে রুটি তুলে দেওয়া শিশু কন্যা তুবা চার মাস পর বিদ্যালয়ে ফিরেছে। বৃহস্পতিবার (পহেলা অক্টোবর) সকালে তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যান বরিশালের উজিরপুর উপজেলার মানবিক নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা। সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে ফিরতে পেরে ছোট্ট তুবা ভীষণ খুশি।

স্থানীয় বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবাকে যখন ইউএনও হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তার মা পাশে ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষক, সহপাঠী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ইউএনও মো. আলী সুজা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মেয়েটির সহপাঠীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মেয়েটি যাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য সবার সহযোগিতা চেয়ে ইউএনও মো. আলী সুজা বলেছেন, আমরা সমাজের সব অসঙ্গতি হয়তো দূর করতে পারব না। কিন্তু একটি পরিবারকে সুরক্ষা দিয়ে অন্তত সমাজে একটি মডেল তৈরি করতে পারি। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। আশা করি, আমরা তা পারব।

বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, আমরা তুবাকে সাদরে গ্রহণ করেছি। বাবার সাথে একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর থেকে ও আর বিদ্যালয়ে আসছিল না। তবে তুবা খুবই মেধাবী ছাত্রী। সে যাতে তার পড়াশোনা স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তুবার বাবাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বরিশাল নগরীর একটি মাদকসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সেখানে তাকে তিন মাস রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে উজিরপুর উপজেলার মানবিক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, আমরা পরিবারটির সুরক্ষার পাশাপাশি পুনর্বাসন এবং মেয়েটির পড়াশোনা নিশ্চিত করার ব্যাপারে পর্যায়ক্রমে উদ্যোগ নেব। এ জন্য পরিবারটিকে সুরক্ষা দিতে প্রথমে তুবার বাবা অনিক সরদারকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। সে জন্য আমরা তাকে একটি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। তিন মাস তিনি সেখানে থাকবেন। এর ব্যয়ভার আমরা বহন করব। বৃহস্পতিবার সকালে শিশু তুবাকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হলো। পরবর্তীতে তুবার মায়ের জন্য কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

ইউএনও আরও বলেন, বাবা-মেয়ের ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের অনেকেই পরিবারটিকে সাহায্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের আর্থিক সহায়তা ও উপজেলা প্রশাসনের আর্থিক সহায়তা মিলিয়ে মেয়েটির পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার খরচের ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য মেয়েটির মায়ের নামে একটি স্থায়ী আমানত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেয়েটির বাবা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পর তার জন্যও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের একটি দোকানে চুরির অপবাদ দিয়ে শিশু তুবার বাবা বামরাইল গ্রামের বাসিন্দা অনিক সরদারকে অমানুষিক নির্যাতন করে বাজারের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখেন স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি। পরেরদিন শনিবার সকালে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায় অনিক সরদারের নয় বছর বয়সী চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্রী তুবা। বাবাকে আর মারধর না করার জন্য সে (তুবা) উপস্থিত লোকজনের কাছে আকুতি জানায়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে।

ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি খুঁটির সাথে অনিক সরদারের পা বেঁধে রাখা হয়েছে। তার হাতে একটি চায়ের কাপ। মেয়েটি রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে চায়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন বিভিন্ন কথা বলছেন। বাবার মুখে রুটি তুলে দিতে দিতে মেয়েটি অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল লোকজনের দিকে। এ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরার পর দেশ-বিদেশের কোটি কোটি নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি শিশুটির পাশে দাঁড়াতে এবং পরিবারটিকে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

পরেরদিন ঘটনাস্থলে ছুঁটে আসেন উজিরপুর উপজেলার মানবিক নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা। তিনি অসহায় ওই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য ইউএনওর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শিশু তুবার মা বলেন, ইউএনও স্যারসহ দেশ ও বিদেশের অসংখ্য ব্যক্তি এবং সাংবাদিকরা আমাদের পরিবারের দুঃসময়ে যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে আমরা সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে ইউএনও স্যার এমন উদ্যোগ না নিলে আমাদের স্ব-পরিবারকে দেশত্যাগ করানো হবো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...
https://slotbet.online/