কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে ১৯২২ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ। দুই পাশে বিশাল প্যাডেল চাকার ঘূর্ণনে নদীর বুক চিরে ছুটে চলা এ নৌযান একসময় মানুষের কাছে পরিচিত ছিল ‘রকেট স্টিমার’ নামে।
ব্রিটিশ আমল, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের নদীপথের ইতিহাসে এক নীরব সাক্ষী শতবর্ষী এ স্টিমার। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর মতো ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত এ প্যাডেল স্টিমার। একসময় বাংলার নদীপথকে প্রাণবন্ত করেছিল, পিএস মাহসুদ সে ঐতিহ্যেরই জীবন্ত প্রতিনিধি।
তবে এ নতুন যাত্রার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বিরতি ও পুনর্জাগরণের গল্প। আধুনিক নৌযানের বিস্তার এবং সময়ের পরিবর্তনে ২০২২ সালে নিয়মিত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় পিএস মাহসুদের। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল এর গায়েও—১৯৮৩ সালে স্টিম ইঞ্জিনের জায়গায় আসে ডিজেল, ১৯৯৫ সালে যুক্ত হয় মেকানিক্যাল গিয়ার। তবে দুই পাশের ঐতিহ্যবাহী বিশাল প্যাডেল চাকাটি রয়ে গেছে অক্ষত। পরে জাহাজটিকে সংরক্ষণ ও পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবহারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এর সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ২ কোটি টাকা।
সংস্কার শেষে বিআইডব্লিউটিসি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পিএস মাহসুদকে পর্যটন ট্রিপে পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। কয়েক দফা ভ্রমণসূচিও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় একাধিক ট্রিপ বাতিল করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পর্যাপ্ত প্রচার ও বিপণনের অভাবে অনেক আগ্রহী ভ্রমণকারী ট্রিপের সময়সূচি বা বুকিংয়ের তথ্যই জানতে পারেননি। ফলে প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সংস্থাটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। দুই বছরের জন্য ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর চার্টার ভিত্তিতে পিএস মাহসুদ হস্তান্তর করা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরসের কাছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি বিআইডব্লিউটিসিকে প্রতি মাসে সোয়া ৪ লাখ টাকা ভাড়া পরিশোধ করছে। পাশাপাশি ছয় মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ অর্থ জমা দিতে হয়েছে জামানত হিসেবে।
তবে দায়িত্ব নেয়ার পর গত ছয় মাসে তারা পরিচালনা করেছে মাত্র ১২টি ট্রিপ। সর্বশেষ ভ্রমণটি ছিল চলতি বছরের পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে।
ট্রিপের সংখ্যা কম হলেও এ উদ্যোগকে ব্যর্থতা বলতে নারাজ রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরসের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন হেলাল। বণিক বার্তাকে তিনি জানান, পিএস মাহসুদকে সদরঘাটের সাধারণ যাত্রীবাহী লঞ্চের মতো প্রতিদিন চালানো তাদের লক্ষ্য ছিল না। বরং এটিকে একটি বিশেষায়িত হেরিটেজ ট্যুরিজম পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের উদ্দেশ্য।
রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরসের চেয়ারম্যান বলেন, ‘পিএস মাহসুদ শুধু একটি জাহাজ নয়; এটি বাংলাদেশের নদী-ঐতিহ্যের জীবন্ত অংশ। প্রতিটি ট্রিপই একটি বিশেষ আয়োজন, যেখানে মানুষ শুধু নদী ভ্রমণ করবে না, ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও অংশ হবে। প্রতিদিনের বাণিজ্যিক লঞ্চের সঙ্গে শতবর্ষী এ জাহাজের তুলনা করা ঠিক নয়। নিয়মিত যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, বরং বিশেষ অভিজ্ঞতা দেয়ার জন্যই প্রতিটি ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হয়।’
পিএস মাহসুদের পরিচালন ব্যয়ও কম নয়। রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা ও জ্বালানি ব্যয় মিলিয়ে একটি ট্রিপ লাভজনক করতে প্রয়োজন হয় কমপক্ষে ১৫০-২০০ যাত্রী। তার ওপর রয়েছে সরকারি বিধিনিষেধ। সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী নৌযান হওয়ায় এটিকে সাধারণ যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা যায় না। বুকিং, আবহাওয়া ও নদীপথের অবস্থা বিবেচনায় বিশেষ আয়োজন হিসেবেই ট্রিপ পরিচালনা করতে হয়।
দেশের নদীভিত্তিক পর্যটনের সবচেয়ে উপযোগী সময় বর্ষাকাল সামনে রেখে অবশ্য নতুন পর্যটন ক্যালেন্ডার সাজানো হচ্ছে বলে জানায় জাহাজ পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। মূলত করপোরেট আয়োজন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সফর, সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিশেষ ভ্রমণ, বিদেশী পর্যটক দল ও পারিবারিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি বাজার তৈরির চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিকল্পিতপ্যাকেজগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইভিনিং ক্রুজ: ৩ ঘণ্টার নদী ভ্রমণে জনপ্রতি ব্যয় হবে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, যেখানে থাকছে সূর্যাস্ত ও নদীর হাওয়া উপভোগের সুযোগ। ডে-লং ট্রিপ: দুই-আড়াই হাজার টাকার এ প্যাকেজে থাকবে খাবার ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও। রিভার এক্সপেডিশন: ছোট দলের জন্য ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন রুটে বিশেষ বিলাসবহুল ভ্রমণ। তাই প্রতিষ্ঠানটির আশা, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের অংশগ্রহণ বাড়লে ধীরে ধীরে এ উদ্যোগ লাভজনক হবে।
বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্যিক) এসএম আশিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জাহাজটি চালাতে গিয়ে দেখেছি ঢাকা-বরিশাল রুটে আমাদের লসের পরিমাণ অনেক। জ্বালানি ও লোকবল মিলিয়ে যে খরচ হয়, সে তুলনায় পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যায় না। মূলত যারা ঘুরতে যায় তারাই শুধু এটি ব্যবহার করে, আর জরুরি প্রয়োজনে যারা যাতায়াত করে তারা লঞ্চ বা সড়কপথ বেছে নেয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘পর্যটন মূলত আমাদের মূল কাজ নয়, আমাদের প্রধান কাজ হলো ফেরি, প্যাসেঞ্জার ও কার্গো সার্ভিস দেয়া। তাই নদীভিত্তিক পর্যটনকে উৎসাহিত করতে আমরা সবসময় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করি এবং তাদের মাধ্যমে প্রমোটের চেষ্টা করি।’
জাহাজটির সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিআইডব্লিউটিসির এ পরিচালক বলেন, ‘শতবর্ষী এ জাহাজগুলো আমাদের ঐতিহ্য। সরকার চাচ্ছে এগুলোকে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি না করে সংরক্ষণ করতে। তবে এগুলো এখন আর লং রুটে চালানো ঠিক হবে না। এগুলো ২-৩ ঘণ্টার শর্ট ট্রিপ দেবে অথবা ভাসমান রেস্টুরেন্ট হিসেবে থাকবে। এরই অংশ হিসেবে পিএস মাহসুদে আমরা একটি মেরিটাইম মিউজিয়ামও করেছি, যাতে নতুন প্রজন্ম আমাদের নৌ-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে। আমাদের কাছে থাকা বাকি তিনটি জাহাজের ক্ষেত্রেও একইভাবে বেসরকারি পর্যায়ে প্রমোটের চেষ্টা করব।’
https://slotbet.online/