ঈদের আগেই প্রাণ ফিরেছে ঢাকা সদরঘাটে। টার্মিনালে লঞ্চের হুইসেল, যাত্রীদের চিৎকার, মানুষের ব্যস্ততা ছিল পুরানো দিনের। এই সবই মিলিয়ে সদরঘাটে সেই পুরানো দিনের গল্প মনে হচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎই ধাক্কা। আর সেই ধাক্কাতেই হারিয়ে যায় ২২ বছর বয়সী সোহেল ফকিরের জীবন। তার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে। দুর্ঘটনায় এখনো নিখোঁজ তার বাবা মিরাজ ফকির।
সোহেলের সঙ্গে থাকা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রেশমা আক্তার রুবি গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালের বেডে। এক মুহূর্তে থেমে গেছে এই পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। ভেঙে গেছে তাদের ছোট্ট ভরসার জায়গা।
এই মেহেন্দীগঞ্জই আবার নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের নিজের এলাকা। অর্থাৎ, মৃত মানুষটি শুধু একজন যাত্রী নন, তিনি প্রতিমন্ত্রীর ‘নিজ এলাকার মানুষ’।
ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী যখন কথা বলছিলেন, চারপাশে তখনও আতঙ্কের রেশ। কিন্তু তার কণ্ঠে শোনা যাচ্ছিল অন্য এক ভার।
এটা যেন কেবল দায়িত্বের ভাষা নয়। এটা এক ধরনের অস্বস্তি, এক ধরনের নীরব প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া।
একই পরিবারের ওপর এমন আঘাত সবার হৃদয় ছুয়ে গেছে। সোহেল নেই। তার বাবা মিরাজ হোসেন এখনও নিখোঁজ। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। শরীর আর ভবিষ্যৎ এই দুটো নিয়েই রুবি লড়ছেন।
সদরঘাট পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদেরকে বললেন, সন্তানের অবস্থা ভালো। এই কথাটা শুনে হয়তো এক মুহূর্তের জন্য যারা দুর্ঘটনাটি দেখেছেন, তাদের বুকটা হালকা হয়েছে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই মনে পড়ে, যে সন্তান জন্মাবে সে কি তার বাবার মুখ কোনোদিন দেখবে? বুড়িগঙ্গার জলে তখনও খোঁজ মেলেনি নিখোঁজ সোহেলের বাবা মিরাজ ফকিরের।
বিকাল গড়িয়ে সদরঘাটের বুকে অন্ধকার নামছে ধীরে ধীরে। হাসপাতালে বেডে শুয়ে রুবি একটা খবরের জন্য অপেক্ষা করছেন। স্বামীর ফিরে আসার জন্য প্রতিক্ষায় রয়েছেন। কারণ তিনি পরিবারের খবর জানেন না।
নৌপথের এই দুর্ঘটনা নতুন নয়। গেল ডিসেম্বরে জাকির সম্রাট ৩ লঞ্চটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। চারজনের প্রাণ গেছে। রুটপারমিট স্থাগিত ছিল। আবার চালু হল।
দুর্ঘটনার পর প্রতিবারই কমিটি হয়। তদন্ত হয়, তার পরে প্রতিশ্রুতি আসে। কিন্তু এই ঘটনার ভেতরে অন্য রকম একটা ব্যথা আছে।
কারণ এখানে প্রশাসনের টেবিল আর ব্যক্তিগত বাস্তবতা এক জায়গায় এসে মিশে গেছে।
প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকার এক তরুণের মৃত্যু, এটা কোনো ফাইলের সংখ্যা হয়ে থাকে না। এটা তার চোঁখে ভাসে থাকে মনেও আর ঘুরেফিরে বারবার প্রশ্ন তোলে? এই মৃত্যু কি সত্যিই অনিবার্য ছিল?
উল্লেখ্য, বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সদরঘাটের ১৪ নম্বর পন্টুনে ঢাকা- ভোলার ইলিশা রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে যাত্রী তুলার সময় সংঘর্ষ ঘটে। ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট রুটের জাকির সম্রাট ৩ লঞ্চটি এসে ধাক্কা দেয়।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, লঞ্চের সামনের আঘাতে যাত্রীরা পিষ্ট হচ্ছেন। এক জন পানিতে পড়ে যান, আরেকজন লঞ্চের বাইরের অংশে পড়ে থাকেন।
https://slotbet.online/