• শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন

চিংড়ির রেণু শিকারের নামে ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভা

শেখ মোহাম্মাদ ইসহাক, কুয়াকাটা / ৩২ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

চিংড়ির রেণু শিকারের নামে উপকূলীয় অঞ্চলে অবাধে ধ্বংস করা হচ্ছে শতাধিক প্রজাতির মাছের পোনা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। নিষিদ্ধ মশারি জাল দিয়ে গলদা ও বাগদা চিংড়ির ক্ষুদ্র রেণু সংগ্রহের সময় অন্যান্য প্রজাতির পোনা তীরে ফেলে দেয়ায় প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সংকট।

সরেজমিনে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নিজামপুর এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। সাগরের ঢেউ ও নদীর স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জেলেরা সূক্ষ্ম মশারি জাল টানছেন। কিছুক্ষণ পর জাল তুলে তীরে আনলে তাতে ধরা পড়ে নানা প্রজাতির মাছের পোনা ও অগণিত লার্ভা। জেলে পরিবারের নারী সদস্যরা সেখান থেকে কেবল চিংড়ির রেণু আলাদা করেন। আর বাকি সব পোনা ও লার্ভা মাটিতে ফেলে দেয়া হয়, যার বেশিরভাগই অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যায়।

 
স্থানীয়দের ভাষ্য, জীবিকার তাগিদে অনেক দরিদ্র জেলে পরিবার এই রেণু শিকারে জড়িয়ে পড়লেও এর প্রকৃত সুবিধা ভোগ করছে একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র। তারা জেলেদের ব্যবহার করে কম দামে রেণু সংগ্রহ করে। পরে তা চোরাইপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিংবা বিদেশে পাচার করে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে চক্রটি।
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হলেও তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে নিষিদ্ধ এই কর্মকাণ্ড দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেণু শিকারের ফলে শুধু চিংড়ি নয়, পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রেণু শিকারের সময় অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।’
 
তিনি আরও বলেন, ‘অধিকাংশ রেণু শিকারি জেলে দরিদ্র ও অসহায়। জীবিকার বিকল্প না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এ অবস্থায় কেবল অভিযান চালিয়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়; বরং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।’
 
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, অবৈধ রেণু শিকার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে পাচারকারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
 
এদিকে মৎস্য গবেষণা সংশ্লিষ্ট একটি জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। চিংড়ির রেণু ধরতে গিয়ে ধ্বংস হচ্ছে অন্তত ৩৮ প্রজাতির চিংড়ি, ৬ প্রজাতির মাছ এবং প্রায় ১০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভা।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক মৎস্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ‘নীরব ধ্বংসযজ্ঞ’ একসময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...
https://slotbet.online/