পাওয়ার গ্রিড উপকেন্দ্র বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান পলাশ জানান, বরিশাল নগর ও জেলার মোট বিদ্যুতের চাহিদা বর্তমানে ১৮৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২২ মেগাওয়াট। ফলে ৬৩ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় চাহিদার মাত্র ৬৬ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং বাকি ৩৪ শতাংশ ঘাটতির কারণে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয় ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বরিশাল নগর, সদর উপজেলা, বাবুগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, উজিরপুর, বানারীপাড়া, গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদী ও হিজলাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, দিনে যেমন একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, তেমনি গভীর রাতেও বারবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হচ্ছে এবং তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের কষ্ট বেড়েছে।
বরিশাল নগরের নথুল্লাবাদ এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “গত তিন-চার দিন ধরে লোডশেডিং অনেক বেড়েছে।”
হিজলা উপজেলার বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, “দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। রাতে ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। ঘণ্টাখানেক বিদ্যুৎ থাকে, আবার চলে যায়।”
লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, সন্ধ্যার পর ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সমস্যায় পড়ছেন তারা।
ওজোপাডিকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার জানান, তাদের আওতাধীন এলাকায় বর্তমানে ৬০ থেকে ৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এই বিভাগের আওতায় বরিশাল নগরীর সিএন্ডবি রোড, হাতেম আলী কলেজ এলাকা, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রুপাতলী, সাগরদী, আলেকান্দা, কালিজিরাসহ বেশ কয়েকটি শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা রয়েছে।
অন্যদিকে ওজোপাডিকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সোহেল রানা জানান, পিক আওয়ারে ৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে এবং প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এই বিভাগের আওতায় নথুল্লাবাদ, বিএম কলেজ, জেনারেল হাসপাতাল, সদর রোড, চকবাজার, গীর্জা মহল্লা, পলাশপুর, কাউনিয়া, আমানতগঞ্জ, বিসিক, নতুন বাজার ও কবি জীবনানন্দ দাশ সড়কসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমৃদ্ধ এলাকাগুলো রয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার এ বি এম মিজানুর রহমান জানান, সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ৫৬ মেগাওয়াট প্রয়োজন হলেও তারা পেয়েছেন ৪৬ মেগাওয়াট। তবে মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ। এসব এলাকায় চাহিদার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, “মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ এবং বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদের একটি অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী মূল সঞ্চালন লাইনের তার ছিঁড়ে গেছে। বিকল্প লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সেটি পর্যাপ্ত লোড বহন করতে পারছে না। এ কারণেই এসব এলাকায় তুলনামূলক বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।”
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার বিপুল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, তাদের আওতাধীন বাবুগঞ্জ, বানারীপাড়া, উজিরপুর, গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া এলাকায় বর্তমানে ৫৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এসব এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক কম হলেও সরবরাহ এখনও চাহিদার তুলনায় কম রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যসেবায় আরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।






