একসময় প্রতিদিন নিজের পোষা পাখির পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন ‘মেটালফ্রিক’ (ছদ্মনাম)। পাখিটিকে আদর করতেন, খাঁচা পরিষ্কার করতেন, কখনো ডানা মেলে ওড়ার সুযোগ করে দিতেন। কিন্তু এখন আর সেই আগ্রহ নেই। ঢাকার একটি অগোছালো কক্ষে গা এলিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আর ওসবের জন্য নিজেকে টেনে নিতে পারি না। কার কী আসে যায়?’
মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি মাদক ‘ইয়াবা’র প্রতি তার আসক্তি আজ তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবনও ছারখার করে দিচ্ছে কমলা রঙের এই ছোট ট্যাবলেট। মেটালফ্রিকের ভাষায়, ‘এই জিনিসটা আমার মস্তিষ্ককে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।’
থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করার ওষুধ’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে লাখ লাখ মানুষ এই মাদকে আসক্ত এবং সেই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই।
নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় তিনি জানান, একটি অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ওপর বড়িটি রেখে নিচ থেকে তাপ দেওয়া হয়। সেখান থেকে বের হওয়া ধোঁয়াই তিনি গ্রহণ করেন। প্রতিটি বড়ির প্রভাব প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এর প্রভাবে তিনি টানা তিন দিন পর্যন্ত জেগে থাকতে পারেন। তবে পরে শরীর ভেঙে পড়লে টানা ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ঘুমাতে হয়।
গত জুন মাসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে ৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্ত। তার মতে, নতুন নতুন ‘সিন্থেটিক’ ও ‘সেমি-সিন্থেটিক’ মাদকের আবির্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। চলতি মাসেই সংসদ মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে একটি বিল পাস করেছে।
বাংলাদেশে ইয়াবা ‘ক-শ্রেণির’ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৮ সালে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালিত হয়। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মাদকবিরোধী অভিযানের আদলে পরিচালিত সেই অভিযানে মাত্র কয়েক মাসে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে মোট ৪৬৬ জন নিহত হন। সংস্থাটির দাবি, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে দরিদ্র এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ভয় তৈরি হয়েছিল যে, মাদকের সামান্য সন্দেহেও তাদের স্বজন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হতে পারেন। ওই সময় গ্রেপ্তার হন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
এত কিছুর পরও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের ব্যবহার কমেনি; বরং বেড়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার এবং ঢাকার ‘নিরাময়’ পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘মাদকের ব্যবহার কমাতে হলে আমাদের আগে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করতে হবে।’
তিনি জানান, পুরো বাংলাদেশে মাত্র ৩৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে অনেক সময় একজন চিকিৎসককে এক ঘণ্টায় ২০ জন রোগী পর্যন্ত দেখতে হয়। ডা. আরিফুজ্জামান মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূত করা প্রয়োজন। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশে মানসিক সমস্যায় ভোগা প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ লোকলজ্জা বা সচেতনতার অভাবে চিকিৎসা নেন না।
বর্তমানে ইয়াবা আসক্তি অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অনেক ব্যবহারকারী ইয়াবার পাশাপাশি হেরোইন বা বুপ্রেনরফিন ইনজেকশনের মতো অন্যান্য মাদকেও আসক্ত। ডা. আরিফুজ্জামান জানান, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা কোভিড-১৯ মহামারীর মতো সংকট মানুষকে অনেক সময় মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। আবার অনেকে নিজের আসক্তির খরচ জোগাতে মাদক কারবারেও জড়িয়ে পড়েন।
জাতিসংঘের ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম অফিসের তথ্যমতে, ইয়াবা নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এশিয়াজুড়ে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওস সীমান্তবর্তী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চল বর্তমানে সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম বড় কেন্দ্র। ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়। বাংলাদেশে আসা ইয়াবার প্রধান উৎস হিসেবে মিয়ানমারকে দায়ী করা হয়।
মেটালফ্রিক বলেন, ‘সবারই এক করুণ জীবনকাহিনী আছে।’ তার মতে, দেশে ইয়াবা আসক্তির শুরু সাধারণত সিগারেট দিয়ে, এরপর গাঁজা, তারপর কফ সিরাপ। ইয়াবা গ্রহণের আগে তিনিও গাঁজায় আসক্ত ছিলেন। প্রথমবার ইয়াবা নেওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন এটি হয়তো তাকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু বাস্তবে এটি তার জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। তার ভাষায়, ‘এই জিনিস মানুষকে পশু বানিয়ে ফেলে।’
তার দাবি, আগে ইয়াবা দামি থাকলেও এখন বাজারে সস্তা ও দামি—দুই ধরনের বড়ি পাওয়া যায়। সস্তা ইয়াবা মানুষের দাঁত ও মুখের মারাত্মক ক্ষতি করে। দীর্ঘদিন ইয়াবা সেবনের কারণে তার অনেক বন্ধু স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন, কেউ দাঁত হারিয়েছেন, আবার কেউ শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে আফিম বা হেরোইন পাওয়া তুলনামূলক কঠিন হলেও ইয়াবা সহজলভ্য। ঢাকার মোহাম্মদপুরের মতো এলাকাগুলোতে কিশোরদের হাতেও ইয়াবার প্যাকেট দেখা যায়। এমনকি রিকশাচালকরাও সহজেই এটি কিনতে পারেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন বলে ধারণা করা হয়, যার পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দেশের তরুণ সমাজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
মেটালফ্রিকের ব্যক্তিগত জীবনেও সেই অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট। তার মুক্তিযোদ্ধা বাবা সম্প্রতি মারা গেছেন, যাকে এখন কেউ কেউ ‘ভণ্ড’ বলে অপবাদ দেন। তার নিজের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন তার দিনের বড় একটি অংশ কেটে যায় ইনস্টাগ্রামে গাজায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখে। তার ক্ষোভ পশ্চিমা গণমাধ্যম ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি। তার ভাষায়, ইয়াবা তাকে এক ধরনের ‘ভুয়া আত্মবিশ্বাস’ দেয়, যার ফলে তিনি নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
মেটালফ্রিক মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাই সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ ও মাদকাসক্তিকে প্রভাবিত করে। তার মতে, সচ্ছল পরিবারের মানুষের হাতে অবসর সময় বেশি থাকায় অনেকেই আসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান যে অন্তত মাথা গোঁজার একটি ঘর আছে। আমাকে ভাবতে হয় না, কাল কে আমাকে বা আমার পরিবারকে খাওয়াবে।’
তবে মাদকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে তিনি আতঙ্কিত। তার আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ঘুমহীন জীবনযাপনের কারণে ইয়াবা সেবনকারীরা বড়জোর দুই বছর টিকে থাকতে পারেন। বিষণ্ণ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এটি একটি মন্থর বিষক্রিয়া; অত্যন্ত নিপুণভাবে করা এক ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা।’
https://slotbet.online/